প্রকাশিত:
গতকাল

বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার পর নতুন করে আশার আলো দেখছেন কলকাতার নিউ মার্কেট এলাকার ব্যবসায়ীরা। শুক্রবার আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচনের ফল প্রকাশিত হয়। একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করতে যাচ্ছে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন দল।বিশেষ করে গত দেড় বছরের অস্থিরতা ও ভিসা জটিলতায় ধুঁকতে থাকা কলকাতার ব্যবসা-বাণিজ্য এবার ঘুরে দাঁড়াবে বলে মনে করছেন ব্যবসায়ীরা।
নিউ মার্কেট এলাকা দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশি পর্যটক, চিকিৎসা সেবা ও কেনাকাটার জন্য আগত ক্রেতাদের অন্যতম গন্তব্য। হোটেল মালিক, পরিবহন ব্যবসায়ী, মানি এক্সচেঞ্জ প্রতিষ্ঠান, স্বাস্থ্য পরিষেবা প্রদানকারী, পোশাক ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে ছোট মুদি দোকান ও চায়ের দোকানি-প্রায় সকলেই বাংলাদেশি ক্রেতাদের ওপর অনেকাংশে নির্ভরশীল।
ব্যবসায়ীদের দাবি, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বাংলাদেশে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পরবর্তী সময়ে দুই দেশের সম্পর্কে টানাপোড়েন তৈরি হয়। এর প্রভাব পড়ে ভিসা ইস্যু ও সীমান্ত পারাপারে। ফলে বাংলাদেশ থেকে কলকাতায় আগত মানুষের সংখ্যা প্রায় ৯০ শতাংশ পর্যন্ত কমে যায়। এতে নিউ মার্কেট কেন্দ্রিক ব্যবসায়ীরা বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েন।
কলকাতার নিউ মার্কেট এলাকা এবং মারকুইজ স্ট্রিটের হোটেল ব্যবসার প্রাণভোমরা হলো বাংলাদেশি পর্যটকরা। গত ১৮ মাস ধরে পর্যটক ও ক্রেতার অভাবে এই এলাকার ব্যবসা প্রায় ৪০-৫০ শতাংশ কমে গিয়েছিল।
কলকাতার অধিকাংশ মাঝারি মানের হোটেল বাংলাদেশি অতিথিদের ওপর নির্ভরশীল। নির্বাচনের পর বাংলাদেশে স্থিতিশীলতা ফিরে এলে এবং ভারত সরকার ভিসা প্রক্রিয়া শিথিল করলে আবারও পর্যটকদের ভিড় বাড়বে বলে মনে করছেন হোটেল মালিকরা।
জামাকাপড়, কসমেটিকস ও চামড়াজাত পণ্যের বড় ক্রেতা বাংলাদেশিরা। ব্যবসায়ীদের মতে, বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে বর্তমানে যে ‘ইন্ডিয়া আউট’ ক্যাম্পেইন বা ক্ষোভ ছিল, বিএনপির জয়ের মাধ্যমে একটি গণতান্ত্রিক ম্যান্ডেট আসায় সেই নেতিবাচক মানসিকতা কমে গিয়ে স্বাভাবিক বাণিজ্যিক সম্পর্ক ফিরে আসবে।
কলকাতার বড় হাসপাতালগুলোতে (যেমন: অ্যাপোলো, আর এন টেগোর, পিয়ারলেস) চিকিৎসার জন্য যাওয়া বাংলাদেশিদের সংখ্যা গত এক বছরে তলানিতে গিয়ে ঠেকেছিল।
চিকিৎসার উদ্দেশ্যে আসা বাংলাদেশিদের অনুপস্থিতিতে দক্ষিণ কলকাতার মুকুন্দপুর বা ইস্টার্ন বাইপাস সংলগ্ন গেস্ট হাউস ও ছোট দোকানদাররা চরম ক্ষতির মুখে পড়েছিলেন। বিএনপির জয়ের পর দিল্লির পক্ষ থেকে অভিনন্দন বার্তা আসায় তারা মনে করছেন, দ্রুতই ভিসা সংকট মিটে যাবে এবং রোগীরা আবারও কলকাতা ফিরতে শুরু করবেন।
মানি এক্সচেঞ্জ ও ট্রাভেল এজেন্সি ব্যবসায়ীরাও একই আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন। তাদের প্রত্যাশা, দুই দেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক হলে পর্যটন, চিকিৎসা ভ্রমণ ও কেনাকাটার জন্য কলকাতায় বাংলাদেশিদের আগমন আবারও বাড়বে।
কলকাতার 'ফেডারেশন অব চেম্বার অব কমার্স' (FICCI) এর সূত্রগুলো বলছে, বিএনপি ক্ষমতায় এলে কেবল খুচরা ব্যবসা নয়, বরং পেঁয়াজ, চিনি ও বস্ত্রের মতো পণ্য রপ্তানিতেও ভারসাম্য ফিরে আসবে। ব্যবসায়ীদের দাবি, গত কয়েক মাস ধরে বর্ডার বাণিজ্যে যে অনিশ্চয়তা ছিল, তা দূর করতে দুই দেশের নতুন নেতৃত্বের মধ্যে বাণিজ্যিক আলোচনা জরুরি।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ইতিমধ্যে তারেক রহমানকে অভিনন্দন জানিয়েছেন এবং তাকে শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। দিল্লির এই দ্রুত ইতিবাচক সাড়া কলকাতার ব্যবসায়ীদের মনে আত্মবিশ্বাস বাড়িয়েছে। তারা মনে করছেন, রাজনৈতিক আদর্শ ভিন্ন হলেও বাস্তবসম্মত বাণিজ্যিক স্বার্থেই দুই দেশ এবার কাছাকাছি আসবে।
"আমরা রাজনীতির চেয়ে রুটি-রুজিকে বড় করে দেখি। গত দেড় বছর আমাদের দোকানগুলো ফাঁকা ছিল। বাংলাদেশের মানুষ না এলে কলকাতার বড়বাজার বা নিউ মার্কেট অচল। বিএনপির জয়ের মাধ্যমে যদি স্থিতিশীলতা আসে এবং ভিসা সহজ হয়, তবেই আমাদের সুদিন ফিরবে।"
ব্যবসায়ীদের ভাষায়, নিউ মার্কেটের প্রাণই হলো বাংলাদেশি ক্রেতারা। তারা আশা করছেন, নতুন সরকারের অধীনে কূটনৈতিক সম্পর্ক উন্নত হবে, ভিসা দেয়া বাড়বে এবং কলকাতার ‘মিনি বাংলাদেশ’ আবারও ফিরে পাবে তার হারানো ছন্দ।
এএন