প্রকাশিত:
গতকাল

বাংলাদেশের বৈদেশিক অর্থায়নের চিরাচরিত ধারায় একটি বড় ধরনের স্থবিরতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে (জুলাই-জানুয়ারি) বাংলাদেশের তিন প্রধান দ্বিপাক্ষিক উন্নয়ন সহযোগী—ভারত, চীন ও রাশিয়া—থেকে নতুন কোনো ঋণের প্রতিশ্রুতি পাওয়া যায়নি। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ERD) সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, নতুন প্রকল্পের জন্য এই দেশগুলোর পক্ষ থেকে কোনো অর্থায়নের ঘোষণা না আসা ভূ-রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্কের এক নতুন সমীকরণ নির্দেশ করছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই চিত্রটি কেবল অর্থনৈতিক নয়, বরং এর পেছনে লুকিয়ে আছে গভীর রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক কারণ। ৫ আগস্ট ২০২৪-এর পটপরিবর্তনের পর বাংলাদেশের সাথে এই দেশগুলোর সম্পর্কের যে রদবদল হয়েছে, তারই প্রতিফলন ঘটছে ঋণের এই পরিসংখ্যানে।
সাউথ এশিয়া নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান এই পরিস্থিতিকে দেখছেন ভিন্ন দৃষ্টিতে। তিনি মনে করেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সাথে বিশেষ করে ভারতের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের টানাপোড়েন সরাসরি ঋণ প্রতিশ্রুতিতে প্রভাব ফেলেছে।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই 'ঋণ খরা'র পেছনে বেশ কিছু কৌশলগত কারণ কাজ করছে:
২০২৪ সালের আগস্ট-পরবর্তী রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে অন্তর্বর্তী সরকার আগের অনেক মেগা প্রকল্পের উপযোগিতা ও স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। ভারতের 'লাইন অফ ক্রেডিট' (LoC) এবং রাশিয়ার রূপপুর প্রকল্পের মতো বড় বাজেটের চুক্তিতে অর্থ ব্যয়ের ন্যায্যতা যাচাই করা হচ্ছে। সরকারের এই ‘সতর্ক অবস্থান’ দাতা দেশগুলোকে নতুন প্রতিশ্রুতি দিতে ধীরমুখী করেছে। বর্তমান সরকার অপেক্ষাকৃত চড়া সুদের দ্বিপাক্ষিক ঋণের চেয়ে বিশ্বব্যাংক বা এডিবির মতো বহুজাতিক সংস্থার সহজ শর্তের ঋণের দিকে বেশি ঝুঁকছে। বিশেষ করে চীনের কাছ থেকে ঋণ নেওয়ার ক্ষেত্রে 'ঋণফাঁদ' এড়ানোর জন্য বাড়তি সতর্কতা নেওয়া হচ্ছে।দিল্লির সাথে সম্পর্কের বর্তমান শীতলতা এবং রাশিয়ার ওপর আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার জটিলতা নতুন কোনো বড় চুক্তির পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
নতুন প্রতিশ্রুতি না থাকলেও পুরনো প্রকল্পের অর্থছাড় কিন্তু থেমে নেই। তবে উদ্বেগের বিষয় হলো, নতুন ঋণের চেয়ে কিস্তি পরিশোধের চাপ এখন অনেক বেশি।
রাশিয়া রূপপুর প্রকল্পের জন্য আগের প্রতিশ্রুত অর্থ ছাড় করছে, তবে নতুন কোনো প্রকল্পে আগ্রহ দেখায়নি। চীন ও ভারত বর্তমানে কেবল চলমান প্রকল্পগুলোর কাজ শেষ করার দিকে মনোযোগ দিচ্ছে।
তথ্যমতে, গত ছয় মাসে বাংলাদেশ যে পরিমাণ বৈদেশিক ঋণ পেয়েছে, তার বড় অংশই ব্যয় হয়েছে পুরনো ঋণের আসল ও সুদ পরিশোধে। জুলাই-নভেম্বর সময়ে ১.৯৫ বিলিয়ন ডলার ঋণের বিপরীতে ১.৮৯ বিলিয়ন ডলারই পরিশোধ করতে হয়েছে।
ভারত-চীন-রাশিয়ার এই নিস্তব্ধতার সুযোগে বাংলাদেশ এখন এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (ADB) এবং বিশ্বব্যাংকের ওপর বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম ভাগে প্রাপ্ত প্রতিশ্রুতির সিংহভাগই এসেছে এসব বহুজাতিক সংস্থা থেকে। বাজেট সহায়তা হিসেবে এডিবি ও বিশ্বব্যাংকের কাছ থেকে বড় অংকের অর্থায়ন পাওয়ায় সরকার দ্বিপাক্ষিক ঋণের জন্য আপাতত খুব একটা চাপ দিচ্ছে না।
ড. সেলিম রায়হানের মতে, ‘নতুন সরকার বড় প্রকল্প নেওয়ার ক্ষেত্রে আগের চেয়ে অনেক বেশি সতর্ক। বিগত সরকারের নেওয়া কিছু বড় প্রকল্পে স্বচ্ছতা ও ব্যয়ের ন্যায্যতা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন ছিল। তাই বর্তমান সরকার রাশিয়ার রূপপুর প্রকল্প বা চীনের অর্থায়নের প্রকল্পগুলো নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ করছে। এই সতর্ক অবস্থানই হয়তো দাতা দেশগুলোর দিক থেকে নতুন প্রতিশ্রুতির গতি ধীর করে দিয়েছে।’
বিশেষজ্ঞদের মতে, দ্বিপাক্ষিক ঋণ সাধারণত দেশগুলোর রাজনৈতিক সম্পর্কের প্রতিফলন। ভারত ও চীনের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্কের স্থিতিশীলতা ফিরে এলে আবারও ঋণের প্রবাহ বাড়তে পারে। তবে সরকার এখন মেগা প্রকল্পের বদলে ছোট ও উৎপাদনশীল প্রকল্পে অর্থায়নকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে।
ভারত, চীন ও রাশিয়ার সাথে বাংলাদেশের ঋণ সম্পর্ক এখন ‘অপেক্ষা ও পর্যবেক্ষণ’ (Wait and Watch) মোডে রয়েছে। মেগা প্রকল্পের মোহ কাটিয়ে বাংলাদেশ এখন টেকসই ও স্বল্প সুদের অর্থায়নের মাধ্যমে ভারসাম্য রক্ষার চেষ্টা করছে।
আগামী ১৭ ফেব্রুয়ারি তারেক রহমানের নেতৃত্বে নতুন নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নিতে যাচ্ছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, নির্বাচিত সরকারের সাথে ভারত বা চীনের দ্বিপাক্ষিক আলোচনা পুনরায় নতুন গতি পাবে। তবে অন্তর্বর্তী সরকারের এই দেড় বছরের ‘সতর্ক ঋণ নীতি’ হয়তো ভবিষ্যৎ সরকারের জন্য ঋণের বোঝা কমানোর একটি ভিত্তি হিসেবে কাজ করবে।
এএন