প্রকাশিত:
২৬ নভেম্বর, ২০২৫

গাড়ির ভেতর তিন শিশু চিৎকার করে কাঁদছে—'মা, আমাদের এখান থেকে নিয়ে যাও'। আর চালকের পাশের আসনে বসে মা জয়নাব জাভাদলি মুঠোফোনে লাইভ করে সাহায্যের আকুতি জানাচ্ছেন। এই দৃশ্য মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়েছিল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে।
সেদিন সাবেক স্বামী ও দুবাই রাজপরিবারের সদস্য শেখ সাঈদের লোকজনের বাধা এড়িয়ে সন্তানদের নিয়ে বাড়ি ফিরতে পারলেও এখন চরম আতঙ্কে দিন কাটছে জয়নাবের। নিজের সন্তানদের 'অপহরণ'র অভিযোগে যেকোনো সময় গ্রেপ্তার হতে পারেন তিনি। সাবেক মিস আজারবাইজান থেকে দুবাইয়ের রাজবধু হওয়া জয়নাব এখন তিন মেয়েকে নিয়ে নিজ বাড়িতেই একরকম অবরুদ্ধ।
দুবাইয়ের শাসক পরিবারের সদস্য শেখ সাঈদ বিন মাকতুম বিন রশিদ আল মাকতুমের সাবেক স্ত্রী তিনি। ২০১৯ সালে বিচ্ছেদের পর থেকেই সন্তানদের কাস্টডি নিয়ে দুজনের মধ্যে আইনি লড়াই চলছে। সম্প্রতি এই দ্বন্দ্ব চরম আকার ধারণ করে।
সন্তানদের নিয়ে টানাপোড়েনের সর্বশেষ ঘটনাটি ফেসবুকে সরাসরি সম্প্রচার করেন জয়নাব। এ কারণে তার বিরুদ্ধে 'অপহরণ'র পাশাপাশি সাইবার অপরাধ আইনেও অভিযোগ আনা হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তিনি।
তার ব্রিটিশ আইনজীবী ডেভিড হেইগকে পাঠানো এক ভিডিও বার্তায় জয়নাব বলেন, 'আমি জানতাম, সন্তানদের সাথে থাকার এটাই আমার শেষ সুযোগ। ওরা হয়তো আর কখনোই আমাকে মেয়েদের সাথে দেখা করতে দিত না। তাই নিরুপায় হয়ে লাইভস্ট্রিম চালু করি এবং সাহায্যের আবেদন জানাই।'
জয়নাবের দাবি, ২০২২ সালে দুবাইয়ের শাসকের সাথে এক চুক্তির মাধ্যমে তিনি তার মেয়েদের ১৮ বছর বয়স পর্যন্ত নিজের কাছে রাখার অধিকার পেয়েছিলেন। বিনিময়ে তিনি সংবাদমাধ্যমে কথা না বলা ও লাইভস্ট্রিম না করার শর্ত মেনে নেন। সম্প্রতি আদালত তার শিশুদের কাস্টডি তাদের বাবাকে দেওয়ার রায় দেন। যদিও জয়নাবকে আশ্বস্ত করা হয়েছিল যে আগের চুক্তিতে সমস্যা হবে না, কিন্তু বাস্তবে তা ঘটেনি।
ঘটনার সূত্রপাত দুই মাস আগে। নিয়মিত সাক্ষাতের অংশ হিসেবে সন্তানেরা বাবার কাছে যাওয়ার পর জয়নাবকে জানানো হয়, মেয়েদের আর ফেরত দেওয়া হবে না। দীর্ঘ বিরতির পর গত ৮ নভেম্বর শিশু সুরক্ষা কেন্দ্রে মেয়েদের সাথে তিন ঘণ্টা দেখা করার অনুমতি পান তিনি।
জয়নাব বলেন, সেখানে গিয়ে তিনি দেখেন তার মেয়েরা নেই। পরে ভবন থেকে বের হওয়ার সময় সন্তানেরা দৌড়ে তাঁর কাছে চলে আসে। তখনই তিনি তাদের গাড়িতে তুলে নেন। কিন্তু সাবেক স্বামীর লোকজন পথ আটকালে তিনি লাইভে এসে বাঁচার আকুতি জানান।
সেদিন কোনো রকমে বাড়ি ফিরলেও এরপর থেকে গ্রেপ্তারের ভয়ে আর বের হওয়ার সাহস পাচ্ছেন না তিনি। তার তিন মেয়ে (বয়স ৯, ৭ ও ৬) স্কুলেও যেতে পারছে না।
বিবিসি এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে আরব আমিরাতের কর্মকর্তাদের সাথে যোগাযোগ করে সাড়া পায়নি। তবে আদালতের নথিপত্র অনুযায়ী, শেখ সাঈদের অভিযোগ—জয়নাব চালকের সহায়তায় জোর করে শিশুদের গাড়িতে তুলে অপহরণ করেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিডিও প্রকাশ করে তিনি রাষ্ট্রকে হেয় করেছেন।
এর আগে সাঈদের আইনজীবীরা আদালতে দাবি করেছিলেন, জয়নাব মা হিসেবে অযোগ্য। তিনি মেয়েদের স্কুলে পাঠাননি এবং তাদের অনুপযুক্ত পরিবেশে রেখেছেন। জয়নাব ও তার আইনজীবীরা অবশ্য এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
দুবাই রাজপরিবারের নারীদের নিয়ে এমন ঘটনা এটিই প্রথম নয়। এর আগে ২০১৯ সালে প্রাণভয়ে দুবাই ছেড়ে পালিয়েছিলেন শাসক শেখ মোহাম্মদ বিন রশিদ আল মাকতুমের সাবেক স্ত্রী প্রিন্সেস হায়া। পরে যুক্তরাজ্যের আদালতে তিনি সন্তানদের জিম্মা পান।
এছাড়া ২০১৮ সালে দেশ ছেড়ে পালানোর চেষ্টার সময় আলোচনায় এসেছিলেন প্রিন্সেস লতিফা।
জয়নাব ও তার আইনজীবীর মতে, দুবাই নারী অধিকারের কথা জোরেশোরে প্রচার করলেও রাজপরিবারের চাকচিক্যের আড়ালে অনেক নারীর পরিস্থিতি আসলে বেশ ভয়াবহ ও অস্বস্তিকর।