প্রকাশিত:
১১ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬

একসাথে এই বিপুলসংখ্যক কর্মকর্তার পদোন্নতির উদ্যোগ যে নজিরবিহীন, তা স্বীকার করেছেন খোদ উপাচার্য এবং রেজিস্ট্রার।
প্রশাসনের কয়েকজন কর্মকর্তা হিসাব কষে বলছেন, এ উদ্যোগ বাস্তবায়ন হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের বেতন খাতে বছরে ব্যয় বাড়বে সাড়ে ৩ কোটি টাকা; প্রভাব পড়বে পেনশনেও।
বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মচারী নিয়োগ ও পদোন্নতি নীতিমালা-২০২০ অনুযায়ী, সহকারী রেজিস্ট্রারের অনুমোদিত মোট পদের এক-তৃতীয়াংশকে ডেপুটি রেজিস্ট্রার হিসেবে পদোন্নতি দেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
একাধিক কর্মকর্তা জানান, বর্তমানে রেজিস্ট্রার দপ্তরে অনুমোদিত সহকারী রেজিস্ট্রারের পদের সংখ্যা ১২। সেখানকার এক-তৃতীয়াংশ, অর্থাৎ বছরে ৪ জন করে পদোন্নতি পাওয়ার সুযোগ রয়েছে। এ দপ্তরের বাইরে সহকারী রেজিস্ট্রার সমমানের পদ আছে ৫১টি, যেখান থেকে ১৭ জনকে পদোন্নতির সুযোগ রয়েছে।
সবমিলিয়ে বছরে ২১ জন সহকারী রেজিস্ট্রারকে পদোন্নতি দেওয়ার সুযোগ রয়েছে জানিয়ে তারা বলছেন, ২১ জনের বিপরীতে ২০৭ জনকে পদোন্নতি দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনে নতুন ‘বৈষম্য’ সৃষ্টি করবে।
জানতে চাইলে উপাচার্য অধ্যাপক নিয়াজ আহমদ খান বলেন, “সরকারের অন্যান্য অফিসের মত যদি কেউ বঞ্চিত হয়ে থাকেন, সেজন্য আমরা একবার নির্দিষ্ট শর্ত সাপেক্ষে তাদের পদোন্নতি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।”
‘নজিরবিহীন’ উদ্যোগ
রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে পদোন্নতির জন্য আবেদন আহ্বান করে রেজিস্ট্রার অফিস।
সেখানে বলা হয়, “ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন অফিস/বিভাগ/হল/ইনস্টিটিউট/গবেষণা কেন্দ্রসমূহে কর্মরত সকল পর্যায়ের কর্মকর্তাদের পরবর্তী পদে পদোন্নতি প্রদানের নিমিত্তে সিন্ডিকেট (০৯-০৯-২০২০ ও ১৩-১১-২০২৪) কর্তৃক অনুমোদিত নীতিমালা অনুযায়ী যারা ৩১ ডিসেম্বর ২০২৪ তারিখের মধ্যে পদোন্নতির শর্তপূরণ করেছেন তাদের নিকট হতে ২০২৪ সালের পদোন্নতির (আপগ্রেডিং) দরখাস্ত আহ্বান করা যাচ্ছে।
“তবে, সিন্ডিকেট (১৩-১১-২০২৪) কর্তৃক গঠিত কমিটি পদোন্নতির নীতিমালা পরিমার্জন, সংযোজন-বিয়োজন ও পুনর্বিবেচনার বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন। উক্ত কমিটির সুপারিশ সিন্ডিকেট কর্তৃক অনুমোদিত হলে তা ২০২৪ সালের পদোন্নতির (যা আগে ঘটবে তা কার্যকর) ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হবে।“
পদোন্নতির সেই নতুন নীতিমালা এখনো চূড়ান্ত হয়নি। আগের নীতিমালার বিধান উপেক্ষা করে দুই দফায় ২০৭ জনকে পদোন্নতির সুপারিশ সিন্ডিকেট গ্রহণ করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে।
এর মধ্যে গত ১ ফেব্রুয়ারি উপাচার্য নিয়াজ আহমদ খানের সভাপতিত্বে সিন্ডিকেট সভায় ১৮৭ জনকে পদোন্নতির সুপারিশ সংবলিত প্রতিবেদন গৃহীত হয়। আর মঙ্গলবার আরও ২০ জনের পুনর্বিবেচনার আবেদন আমলে নেয় সিন্ডিকেট।
রেজিস্ট্রার দপ্তরের একাধিক কর্মকর্তা বলছেন, আগামী ১৬ ও ১৭ ফেব্রুয়ারি এসব আবেদনকারীর সাক্ষাৎকার নেবে পদোন্নতি বোর্ড। এরপর বোর্ডের সুপারিশ সিন্ডিকেটে গৃহীত হলে পদোন্নতি কার্যকর হবে।
জানতে চাইলে রেজিস্ট্রার মুনসী শামস উদ্দিন আহম্মদ বলেন, “আমাদের অফিসার্স সমিতি থেকে গত ১৫ বছরে বঞ্চিত ১৮৭ কর্মকর্তার তালিকা দেওয়া হয়। সেটা উপাচার্যের কাছে গেলে তিনি একটি কারিগরি কমিটি করে দেন।
“সেটার প্রতিবেদন সিন্ডিকেটে গিয়েছে। পরে সিন্ডিকেট থেকে আমাদের একটা নির্দেশনা দিয়েছে। সিন্ডিকেটের নির্দেশনা অনুযায়ী একটা কাজ আগাচ্ছে।”
গত বছরের অক্টোবরে গঠিত ওই কারিগরি কমিটির চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পান রেজিস্ট্রার নিজে। কমিটির সদস্যরা হলেন—অফিসার্স সমিতির সাধারণ সম্পাদক মনোয়ার, প্রক্টর সহযোগী অধ্যাপক সাইফুদ্দীন আহমদ ও সিন্ডিকেট সদস্য অধ্যাপক আবু ইউসুফ।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন কর্মকর্তা বলেন, অফিসার্স সমিতি যে তালিকা দিয়েছে, ‘তাই অনুমোদন করেছে’ কারিগরি কমিটি। সেখানে প্রকৃতপক্ষে কেউ বঞ্চিত কি না তা যাচাই করা হয়নি।
প্রশাসন-২ এর এক কর্মকর্তা বলেন, “আওয়ামী লীগের আমলে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পদোন্নতিতে কে কোন দলের, এটা কখনো বিবেচনা করা হত না।
“নিয়োগের সময় দলের বিষয়টি বিবেচনা করলেও এরকম নজির নেই যে বিএনপি বা জামায়াত দেখে পদোন্নতি থেকে বাদ দিয়েছে। থাকলেও তা হাতে গোনা যাবে।”
তবে কারিগরি কমিটির সদস্য প্রক্টর সাইফুদ্দীন আহমদ বলেন, “এখানে বঞ্চিত হওয়ার বিষয়টি নয়, আমরা দেখেছি দীর্ঘদিন ধরে পদোন্নতির একটা জ্যাম সৃষ্টি হয়েছে।
“অনেকে সিনিয়র ও সমমানের বেতন পাচ্ছে। কিন্তু পদের আপগ্রেডেশন হয়নি। আমরা শুধুমাত্র পদের আপগ্রেডেশনের জন্য সুপারিশ করেছি।”
যোগাযোগ করা হলে অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক ছরোয়ার হোসেন বলেন, “আমরা কর্মকর্তা পদোন্নতির নীতিমালার কারণে দীর্ঘদিন ধরে বঞ্চিত হয়ে আসছি। এ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকরা ১০০ শতভাগ পদোন্নতি পায়, অথচ আমরা পদোন্নতি পাই এক-তৃতীয়াংশ।
“এজন্য আমরা উপাচার্যের কাছে আমরা একটা আবেদন করি যে, আমাদের একটা বিশেষ পদোন্নতি দেওয়া হোক। যাতে করে আমাদের দীর্ঘদিন ধরে যে পদোন্নতি পাচ্ছে না তারা যেন পদোন্নতি পায়। তাই আমরা ১৮৭ জন কর্মকর্তার বিশেষ পদোন্নতির জন্য আবেদন করেছিলাম।”
মঙ্গলবারের সিন্ডিকেট সভায় আরও ২০ জনের আবেদন আমলে নেওয়ার বিষয়ে কারিগরি কমিটির সদস্য প্রক্টর সাইফুদ্দীন আহমদ বলেন, “আমরা অনেক আবেদন যাচাই করতে পারিনি। তাই এবার পুনর্বিবেচনা করার সুযোগ দিয়েছি। আজকে সিন্ডিকেটে সে বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।”
নতুন বৈষম্য!
বছরে যেখানে ২১ জন সহকারী রেজিস্ট্রারকে পদোন্নতির সুযোগ রয়েছে, সেখানে ২০৭ জনকে কীভাবে পদোন্নতি দেওয়া সম্ভব—এমন প্রশ্নের উত্তরে রেজিস্ট্রার মুনসী শামস উদ্দিন আহম্মদ বলেন, “এখানে যারা আবেদন করেছেন, তাদের অনেকে ডেপুটি রেজিস্ট্রার বা সমমানের যে বেতন কাঠামো অনুযায়ী বেতন পায়।
“এখানে শুধু পদের আপগ্রেডেশন হবে। আর তারা যে পদে চাকরি করছেন, সেখানে দীর্ঘদিন থাকায় তা এই গ্রেডে চলে এসেছে। এখানে তাদের ইনক্রিমেন্টটা বাড়বে।”
এভাবে পদোন্নতি দেওয়ার কোনো নজির আছে কি না–প্রশ্ন করলে রেজিস্ট্রার বলেন, “প্রথমবার।” তবে বিপুল সংখ্যক কর্মকর্তাকে পদোন্নতি দেওয়া হলে নিয়মের কোনো ব্যত্যয় হবে না বলে ভাষ্য মুনসী শামস উদ্দিন আহম্মদের। পদোন্নতি প্রক্রিয়া কোন নীতিমালার ভিত্তিতে চলছে, এ প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, “জুলাই অভ্যুত্থানের পর সরকার সব জায়গায় বৈষম্য নিরসনে কাজ করেছে। সেটা অনুসরণ করেই করা হয়েছে।”
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক কর্মকর্তা অভিযোগ করেছেন, তাদের চেয়ে পাঁচ- সাত বছরের জুনিয়র হয়েও অনেকে এবার পদোন্নতির তালিকায় আছেন। ফলে কারিগরি কমিটির সুপারিশ বাস্তবায়ন হলে নতুন করে বৈষম্য সৃষ্টি হবে।
এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে উপাচার্য নিয়াজ আহমদ খান আহমদ বলেন, “এটা একটা জেনারেল সিদ্ধান্ত; সরকারের অনেক অফিস এটা করেছে। “সরকারের অন্যান্য অফিসের মত যদি কেউ বঞ্চিত হয়ে থাকেন, তার জন্য আমরা একবার নির্দিষ্ট শর্ত সাপেক্ষে তাদের পদোন্নতির সিদ্ধান্ত নিয়েছি। তবে কতজনকে দেওয়া হবে তা এখনো ঠিক হয়নি।” ‘বঞ্চিত’ কি না তা কীভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে, জানতে চাইলে তিনি বলেন, “এটা কারিগরি কমিটি করেছে।”
কোন বিধিবলে বিপুলসংখ্যক সহকারী রেজিস্ট্রারকে পদোন্নতি দেওয়া হচ্ছে, এ প্রশ্নের উত্তরে অধ্যাপক নিয়াজ আহমদ বলেন, “এটা প্রথমবার। যা একবারই করা হবে। …সরকারের অন্যান্য দপ্তরের মত আমরা করেছি।”
এদিকে ভোটের দুই দিন আগে মঙ্গলবার সংবাদ সম্মেলন করে উপাচার্য পদ থেকে সরে দাঁড়ানোর ইচ্ছার কথা প্রকাশ করেছেন অধ্যাপক নিয়াজ আহমদ খান। তিনি বলেন, “আমি এখন মনে করছি যে, এটি একটি দায়িত্ব পালনের পর্বে আমরা একটি ভালো পর্যায়ে এসেছি এবং আমি সরে দাঁড়াতে চাই।” তবে তিনি এও বলেছেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের ধারাবাহিকতা রক্ষায় যেন কোনো অসুবিধা না হয়, সেজন্য ‘সরকার চাইলে’ আরো কিছুদিন দায়িত্ব চালিয়ে যেতেও তার আপত্তি নেই।