প্রকাশিত:
৬ জানুয়ারী, ২০২৬

কানাডার এভিয়েশন শিল্পে এক বড় ধরনের পরিবর্তনের ঢেউ লেগেছে। দেশটির সরকার ‘ওপেন স্কাই’ বা উন্মুক্ত আকাশপথ নীতি সম্প্রসারণ করার পর থেকে আন্তর্জাতিক বিমান সংস্থাগুলোর অবাধ যাতায়াত বেড়েছে। এর ফলে সাধারণ যাত্রীরা আগের চেয়ে কম দামে টিকিট পেলেও চরম প্রতিযোগিতার মুখে পড়েছে কানাডার অভ্যন্তরীণ এয়ারলাইন্সগুলো। বিশেষ করে এয়ার কানাডা এবং ওয়েস্টজেটের মতো বড় প্রতিষ্ঠানগুলো এখন বাজার দখল হারানোর শঙ্কায় রয়েছে।
উন্মুক্ত আকাশপথ নীতি হলো এমন একটি আন্তর্জাতিক চুক্তি যার মাধ্যমে বিভিন্ন দেশ একে অপরের আকাশে ফ্লাইট পরিচালনার ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ শিথিল করে। কানাডা সম্প্রতি ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং মধ্যপ্রাচ্যের বেশ কিছু দেশের সাথে এই চুক্তি সম্প্রসারণ করেছে। এর ফলে বিদেশি এয়ারলাইন্সগুলো সরাসরি কানাডার বড় শহরগুলোতে ফ্লাইট সংখ্যা বাড়াতে পারছে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কানাডার বিমান খাতে প্রতিযোগিতার অভাব, উচ্চ ভাড়া, যাত্রী অধিকার ও প্রবেশগম্যতা নিয়ে সংসদীয় কমিটিতে একাধিকবার আলোচনা হয়েছে। বিপরীতে এমিরেটসের মতো মধ্যপ্রাচ্যের এয়ারলাইন্সগুলো তাদের বিশ্বমানের ফার্স্ট ক্লাস সেবার জন্য পরিচিত- যার মধ্যে রয়েছে ক্যাভিয়ার খাবার, বিলাসবহুল স্লিপিং পড এবং বিমানের ভেতর শাওয়ার সুবিধা।
বর্তমান প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান বাণিজ্যযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে বাণিজ্য বহুমুখীকরণের অংশ হিসেবে মধ্যপ্রাচ্যসহ অন্যান্য অঞ্চলের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদারে উদ্যোগ নিয়েছেন। নভেম্বরে ইউএই সফর শেষে তিনি বলেন, “বিশ্ব অর্থনীতি নতুনভাবে গঠিত হচ্ছে। কানাডা পিছিয়ে পড়ছে না।” ওই সফরে ইউএই কানাডায় ৭০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দেয়।
এর এক সপ্তাহ পর পরিবহনমন্ত্রী স্টিভেন ম্যাককিনন ঘোষণা দেন, সৌদি আরব থেকে কানাডায় যাত্রীবাহী ফ্লাইট সংখ্যা বাড়িয়ে সপ্তাহে ১৪টি করা হবে, যা আগে ছিল চারটি। একই সঙ্গে ইউএই থেকে ফ্লাইট সংখ্যা বাড়িয়ে সপ্তাহে ৩৫টি করা হচ্ছে, যা আগে সর্বোচ্চ ছিল ২১টি। পাশাপাশি উভয় দেশের জন্য অসীম কার্গো ফ্লাইটের অনুমতিও দেওয়া হয়েছে।
চুক্তিটি পারস্পরিক হওয়ায় কানাডীয় এয়ারলাইন্সগুলোও একই সংখ্যক ফ্লাইট মধ্যপ্রাচ্যে পরিচালনার সুযোগ পাবে।
এই প্রতিযোগিতার সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগী সাধারণ যাত্রীরা। আগে কানাডা থেকে ইউরোপ বা এশিয়ায় যাওয়ার জন্য সীমিত অপশন থাকায় টিকিটের দাম অনেক বেশি থাকত। বর্তমানে এমিরেটস, কাতার এয়ারওয়েজ এবং বিভিন্ন ইউরোপীয় লো-কস্ট ক্যারিয়ারের ফ্লাইটের সংখ্যা বাড়ায় টিকিটের দাম প্রায় ১৫ থেকে ২৫ শতাংশ কমেছে। ফলে পর্যটন ও ব্যবসায়িক যাতায়াত আগের চেয়ে সাশ্রয়ী হয়েছে।
বিপত্তি বেঁধেছে কানাডার নিজস্ব এয়ারলাইন্সগুলোর ক্ষেত্রে। স্থানীয় এয়ারলাইন্সগুলোর অভিযোগ, তারা বেশ কিছু প্রতিকূলতার সম্মুখীন হচ্ছে, যেমন : পরিচালন ব্যয়,বাজার দখল,চাকরি হারানোর শঙ্কা ইত্যাদি।
কানাডার পরিবহন মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, তারা পরিস্থিতির ওপর নজর রাখছে। তবে এখনই উন্মুক্ত আকাশপথ নীতি থেকে সরে আসার কোনো পরিকল্পনা তাদের নেই। বরং তারা স্থানীয় এয়ারলাইন্সগুলোকে সেবার মান বাড়িয়ে এবং নতুন প্রযুক্তি ব্যবহার করে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার পরামর্শ দিয়েছে।
ম্যাকগিল বিশ্ববিদ্যালয়ের বিমান ব্যবস্থাপনা বিভাগের শিক্ষক ও বিমান বিশেষজ্ঞ জন গ্রাডেক বলেন, “মধ্যপ্রাচ্যের এয়ারলাইন্সগুলো বিশ্বজুড়ে তাদের উচ্চমানের সেবার জন্য ঈর্ষণীয়। তাদের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে হলে কানাডীয় এয়ারলাইন্সগুলোকে নিজেদের মান বাড়াতেই হবে।”
তিনি আরও বলেন, “এয়ার কানাডা, ওয়েস্টজেট ও এয়ার ট্রান্সাটের মতো সংস্থাগুলোকে বিমানের ভেতরের সেবা, সুযোগ–সুবিধা এবং কেবিন কনফিগারেশন নতুন করে ভাবতে হবে।”