প্রকাশিত:
৬ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬

দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের প্রভাব বলয়ের বাইরে একটি নতুন আঞ্চলিক জোট গঠনের জোর তৎপরতা শুরু করেছে পাকিস্তান। প্রস্তাবিত এই জোটে বাংলাদেশ, চীন এবং মিয়ানমারকে অন্তর্ভুক্ত করতে চায় ইসলামাবাদ। মূলত বাণিজ্য, কানেক্টিভিটি এবং প্রযুক্তিগত সহযোগিতার নাম দিয়ে এই ফোরাম গঠনের প্রস্তাব দিলেও ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা একে ভারতের একক আধিপত্যের বিরুদ্ধে একটি নতুন ‘অক্ষ’ হিসেবে দেখছেন।
ঢাকা ও ইসলামাবাদের কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানিয়েছে, জানুয়ারির শেষ সপ্তাহে পাকিস্তান চার দেশীয় বৈঠকের বিষয়ে বাংলাদেশের উচ্চপর্যায়ে প্রস্তাব দেয়। এমনকি ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের আগেই ইসলামাবাদে বাংলাদেশ, চীন, মিয়ানমারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের নিয়ে বৈঠক আয়োজনের প্রস্তুতি নেয়।
কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে, গত জানুয়ারি মাসের শেষ সপ্তাহে পাকিস্তানের উপ-প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার বাংলাদেশের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেনের সাথে একাধিকবার ফোনালাপ করেছেন। এসব আলোচনায় তিনি বাংলাদেশ, চীন এবং মিয়ানমারকে নিয়ে একটি বিশেষ আঞ্চলিক কাঠামো গড়ে তোলার প্রস্তাব দেন।
বাংলাদেশ এই প্রস্তাবের বিষয়ে প্রাথমিকভাবে 'ইতিবাচক' সাড়া দিলেও চূড়ান্ত কোনো প্রতিশ্রুতি দেয়নি। পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন জানিয়েছেন যে, বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদ শেষের দিকে। তাই এ ধরনের বড় কোনো কৌশলগত জোটে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর গঠিত নতুন সরকারের ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।
ঢাকা ইসলামাবাদকে জানিয়েছে: আঞ্চলিক সহযোগিতার যে কোনো উদ্যোগকে বাংলাদেশ স্বাগত জানায়। তবে এটি যাতে অন্য কোনো রাষ্ট্রের (যেমন ভারত) সাথে সম্পর্কের অবনতি না ঘটায়, সেদিকেও নজর রাখা হচ্ছে। মিয়ানমারের বর্তমান অস্থিতিশীল পরিস্থিতির মধ্যে তাদের জোটে রাখা কতটা বাস্তবসম্মত, তা নিয়ে ঢাকার কিছু পর্যবেক্ষণ রয়েছে।
মিয়ানমারের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ইসলামাবাদ সফরের প্রসঙ্গ টেনে পাকিস্তানের উপপ্রধানমন্ত্রী জানতে চান, রোহিঙ্গা ইস্যুটি তিনি উত্থাপন করতে পারেন কি না, এ বিষয়ে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র উপদেষ্টার মতামত কী? এ সময় তৌহিদ হোসেন তাকে রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে সহযোগিতায় ভূমিকা রাখতে পারেন বলে মত দেন।
এম হুমায়ুন কবির বলেন, বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার প্রেক্ষাপটে বঙ্গোপসাগর গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ফলে এখানে চীন একধরনের আগ্রাসী মনোভাব নিয়ে নানা উদ্যোগ নিচ্ছে। আবার বাংলাদেশে ’২৪ সালের আগস্ট–পরবর্তী রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর পাকিস্তানও নানাভাবে সক্রিয় হয়ে উঠেছে। তাই সহযোগিতা শেষ পর্যন্ত চূড়ান্তভাবে দ্বিপক্ষীয় ও আঞ্চলিক ইস্যু নির্দিষ্ট গণ্ডিতে সীমিত থাকছে না।
বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি এই চারদেশীয় ফোরাম বাস্তবে রূপ নেয়, তবে দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের 'নেইবারহুড ফার্স্ট' (Neighborhood First) নীতি বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে। এটি একদিকে যেমন চীনের 'বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ' (BRI)-কে শক্তিশালী করবে, অন্যদিকে দীর্ঘ ১৪ বছর পর ঢাকা-করাচি সরাসরি আকাশ ও নৌপথের যোগাযোগ পুনরায় স্থাপনের পথ আরও সুগম করবে।