প্রকাশিত:
গতকাল

গাজা উপত্যকায় ইসরায়েলি বাহিনীর দীর্ঘকালীন সামরিক অভিযানে যখন হাজার হাজার ফিলিস্তিনি প্রাণ হারাচ্ছেন, তখন মুসলিম বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী দেশ সংযুক্ত আরব আমিরাতের ভূমিকা নিয়ে বিশ্বজুড়ে তোলপাড় শুরু হয়েছে। সম্প্রতি ফাঁস হওয়া বেশ কিছু অত্যন্ত গোপনীয় নথি ও গোয়েন্দা তথ্যে দেখা গেছে, যুদ্ধের পুরোটা সময়জুড়ে ইসরায়েলকে অর্থ, অস্ত্র এবং নিরবচ্ছিন্ন গোয়েন্দা তথ্য দিয়ে সহায়তা করে আসছে আবুধাবি।
ফাঁস হওয়া একটি গোপন নথিতে এ তথ্য উঠে এসেছে। ‘এমিরেটলিকস’ নামের একটি অনুসন্ধানী প্ল্যাটফর্ম নথিটি সংগ্রহ করেছে বলে দাবি করেছে।
নথিটির লেখক হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে হামদান বিন জায়েদ আল-নাহিয়ানের নাম। তিনি আল-ধাফরা অঞ্চলের প্রতিনিধি ও ইউএই রেড ক্রিসেন্ট কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান।
আমিরাতের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের উদ্ধৃতি দিয়ে নথিতে বলা হয়েছে, ২০২০ সালে স্বাক্ষরিত 'আব্রাহাম অ্যাকর্ড' বা আব্রাহাম চুক্তির প্রতি তারা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তাদের মতে, ফিলিস্তিনি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর (হামাস) উত্থান রুখতে ইসরায়েলের সাথে কৌশলগত মিত্রতা তাদের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য অপরিহার্য। এমনকি নথিতে কাতার ও কুয়েতের মতো দেশগুলোর সমালোচনা করা হয়েছে যারা ফিলিস্তিনিদের রাজনৈতিক সমর্থন দিচ্ছে।
নথির শুরুতেই বলা হয়েছে, ‘৭ অক্টোবরের সন্ত্রাসী হামলার’ প্রেক্ষাপটে এবং দুই দেশের মধ্যে বিদ্যমান ‘ঐতিহাসিক চুক্তির’ আলোকে ইসরায়েলকে সহায়তার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।এতে বলা হয়, যৌথ অভিযান কমান্ডের নির্দেশ অনুযায়ী দক্ষিণ লোহিত সাগর অঞ্চলে অবস্থিত ইউএই সামরিক ঘাঁটিগুলো, যেমন- ইয়েমেনের পশ্চিম উপকূলে আল-মোখা, ইরিত্রিয়ার মাসাওয়া ও আসাব এবং সোমালিয়ায় থাকা ঘাঁটিগুলো—ব্যবহার করে ইসরায়েলকে সহায়তা দেওয়ার দ্রুত প্রস্তুতি নেওয়া হয়।
নথিতে সরাসরি বলা হয়েছে, ‘ফিলিস্তিনে সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে ইসরায়েলকে শক্তিশালী করা’ এবং ‘সন্ত্রাসীরা পরাজিত না হওয়া পর্যন্ত’ এই সহায়তা অব্যাহত রাখা প্রয়োজন।ফাঁস হওয়া নথিতে আরও উল্লেখ রয়েছে, ‘সন্ত্রাসবিরোধী কার্যক্রম, গোয়েন্দা তথ্য আদান–প্রদান এবং সামরিক প্রযুক্তি’ ক্ষেত্রে ইসরায়েলের সঙ্গে ‘ঘনিষ্ঠ, সমন্বিত ও সমন্বয়পূর্ণ’ সহযোগিতা জোরদার করার আহ্বান। এতে নিশ্চিত করা হয়েছে, ইসরায়েলকে এক বিলিয়ন ডলার মূল্যের গোয়েন্দা সরঞ্জাম ও প্রযুক্তি সরবরাহ করা হয়েছে।
ইসরায়েলের সঙ্গে ইউএইর পূর্ববর্তী সম্পর্ক এমন যে, তা দেশটিকে সহযোগিতা ও সংকট–সচ্ছলতা উভয় সময়েই পাশে দাঁড়াতে বাধ্য করে। এতে উল্লেখ করা হয়েছে, ইউএই ও ইসরায়েলের মধ্যে সাংস্কৃতিক, কূটনৈতিক, অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা সম্পর্ক অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ এবং ২০২০ সালের ‘ঐতিহাসিক চুক্তি’র পর থেকে এই সম্পর্ক আরও গভীর হয়েছে।
২০২৪ সালে অনুসন্ধানী সংবাদমাধ্যম ‘বালকান ইনসাইট’ প্রকাশ করে, ইউএই–সংযুক্ত একটি প্রতিষ্ঠান ইয়ুগোইমপোর্ট–এসডিপিআর সামরিক বিমানের মাধ্যমে প্রায় ১ কোটি ৭১ লাখ ডলারের অস্ত্র ইসরায়েলে রপ্তানি করেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, এসব অস্ত্র সরাসরি গাজায় চলমান গণহত্যায় ব্যবহৃত হয়েছে।
এ ছাড়া ইউএইভিত্তিক প্রতিষ্ঠানগুলো সাবেক মোসাদ প্রধানের সহ-প্রতিষ্ঠিত সাইবার নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান এক্সএম সাইবারের সঙ্গে চুক্তি করেছে, যার লক্ষ্য জাতীয় জ্বালানি অবকাঠামোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
প্রকাশ্য বিবৃতিতে আরব আমিরাত গাজায় মানবিক সহায়তা পাঠানো এবং যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানালেও, পর্দার আড়ালে ইসরায়েলের সাথে এই গভীর সামরিক আঁতাতকে 'দ্বিমুখী নীতি' হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা। এই খবরটি জানাজানি হওয়ার পর জর্ডান, মিশর এবং তিউনিসিয়াসহ বিভিন্ন আরব দেশে আমিরাতের বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ ও বিক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আমিরাত এই অঞ্চলের ভূ-রাজনীতিতে নিজেদের অবস্থান শক্ত করতে এবং ইরানের প্রভাব কমাতে ইসরায়েলকে একটি নির্ভরযোগ্য 'নিরাপত্তা সঙ্গী' হিসেবে বেছে নিয়েছে। তবে গাজায় চলমান ধ্বংসলীলার মধ্যে এই সহযোগিতা আরব বিশ্বের সংহতিকে বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে ফেলে দিয়েছে।
এদিকে ইউএইর রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিরক্ষা জোট ‘এজ’ ইসরায়েলের শীর্ষ অস্ত্র প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান রাফায়েল ও ইসরায়েল অ্যারোস্পেস ইন্ডাস্ট্রিজ (আইএআই)-এর শেয়ার ধারণ করে বলেও নথি ও সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।