প্রকাশিত:
২১ জানুয়ারী, ২০২৬

গ্রিনল্যান্ড নিয়ে ডেনমার্কের সাথে বিবাদের রেশ কাটতে না কাটতেই এবার ব্রিটিশ মালিকানাধীন দ্বীপপুঞ্জের দিকে নজর দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ভারত মহাসাগরে অবস্থিত কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ চাগোস দ্বীপপুঞ্জ (Chagos Islands) নিয়ে ট্রাম্পের এই নতুন দাবি লন্ডন ও ওয়াশিংটনের মধ্যে কূটনৈতিক উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে।
ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর দ্বিতীয় মেয়াদে বিশ্ব মানচিত্রের নতুন নতুন ভূখণ্ড দখলের বা নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার যে উচ্চাকাঙ্ক্ষা দেখাচ্ছেন, তার সর্বশেষ লক্ষ্যবস্তু এখন ব্রিটেনের নিয়ন্ত্রণে থাকা ‘চাগোস দ্বীপপুঞ্জ’। গ্রিনল্যান্ড নিয়ে ডেনমার্কের সাথে গালিগালাজ এবং কূটনৈতিক যুদ্ধের পর ট্রাম্প এখন তাঁর চিরস্থায়ী মিত্র ব্রিটেনের কাছে দাবি তুলেছেন যে, ভারত মহাসাগরের এই কৌশলগত দ্বীপপুঞ্জটি যেন যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে ছেড়ে দেওয়া হয়।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তার পোস্টে ব্রিটিশ সরকারকে তীব্র কটাক্ষ করে লেখেন, ‘আশ্চর্যজনকভাবে আমাদের “মেধাবী” ন্যাটো মিত্র যুক্তরাজ্য দিয়েগো গার্সিয়া দ্বীপটি মরিশাসের হাতে তুলে দেওয়ার পরিকল্পনা করছে। সেখানে আমাদের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মার্কিন সামরিক ঘাঁটি রয়েছে। কোনো সঙ্গত কারণ ছাড়াই তারা এটি হস্তান্তর করছে।’
চাগোস দ্বীপপুঞ্জ মূলত ভারত মহাসাগরের একটি দ্বীপমালা, যার মধ্যে রয়েছে মার্কিন সামরিক বাহিনীর অত্যন্ত শক্তিশালী ঘাঁটি ‘দিয়েগো গার্সিয়া’। সম্প্রতি ব্রিটিশ সরকার এই দ্বীপপুঞ্জটি মরিশাসের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার একটি চুক্তি করেছে। ট্রাম্পের দাবি, ব্রিটেন যদি এই দ্বীপপুঞ্জ মরিশাসকে দিয়ে দেয়, তবে সেখানে চীনের প্রভাব বাড়বে এবং মার্কিন ঘাঁটি ঝুঁকির মুখে পড়বে। ট্রাম্পের ভাষায়, "ব্রিটেন যদি এটি ধরে রাখতে না পারে, তবে আমাদের এটি কিনে নেওয়া উচিত অথবা সরাসরি নিয়ন্ত্রণ নেওয়া উচিত।"
ট্রাম্পের এই কঠোর অবস্থান ব্রিটিশ সরকারের জন্য একটি বড় ধাক্কা ও চরম অবমাননাকর হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকেরা। কারণ মাত্র ২৪ ঘণ্টা আগেও ডাউনিং স্ট্রিটে এক বক্তব্যে কিয়ার স্টারমার ট্রাম্পের সঙ্গে তার ‘শান্ত ও গভীর সম্পর্কের’ সাফাই গেয়েছিলেন। অথচ কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে ট্রাম্প সেই সম্পর্ককে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিলেন!
ট্রাম্পের এই অনাকাঙ্ক্ষিত দাবিতে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়েছে ব্রিটিশ লেবার সরকার। ডাউনিং স্ট্রিট থেকে জানানো হয়েছে, চাগোস দ্বীপপুঞ্জ মরিশাসকে দেওয়া হলেও সেখানে মার্কিন ঘাঁটি দীর্ঘমেয়াদে বহাল থাকবে। তবে ট্রাম্প এই আশ্বাসে সন্তুষ্ট নন। তিনি মনে করেন, ব্রিটিশ সার্বভৌমত্ব ছাড়া এই ঘাঁটি সুরক্ষিত নয়। বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের এই ‘রিয়েল এস্টেট স্টাইল’ কূটনীতি ব্রিটেনের মতো পুরনো মিত্রকে চরম অস্বস্তিতে ফেলেছে।
১৯৬৫ সালে মরিশাস যখন ব্রিটিশ উপনিবেশ ছিল, তখন ৩ মিলিয়ন পাউন্ডের বিনিময়ে ব্রিটেন এই দ্বীপগুলো আলাদা করে নেয়। ১৯৬০ ও ৭০-এর দশকে সামরিক ঘাঁটি গড়ার প্রয়োজনে হাজার হাজার বাসিন্দাকে ভিটেমাটি থেকে উচ্ছেদ করা হয়, অবশ্য পরে তারা ব্রিটেন ও সেচেলসে স্থায়ী হন। মরিশাস দীর্ঘকাল ধরে এসব দ্বীপের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পেতে আন্তর্জাতিক আদালতে লড়াই করে আসছে। স্বাধীনতার শর্ত হিসেবে এই দ্বীপগুলো জোরপূর্বক কেড়ে নেওয়া হয়েছে বলে তাদের অভিযোগ।
এদিকে ব্রিটিশ ডানপন্থি নেতা এবং রিফর্ম ইউকের প্রধান নাইজেল ফারাজ ট্রাম্পের এই মন্তব্যকে স্বাগত জানিয়ে এক পোস্টে বলেন, ‘ধন্যবাদ যে ট্রাম্প চাগোস দ্বীপপুঞ্জ সমর্পণের এই সিদ্ধান্তের ওপর কার্যত ভেটো দিয়েছেন।’
ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ সূত্রগুলো জানাচ্ছে, প্রেসিডেন্ট ইতিমধ্যেই তাঁর উপদেষ্টাদের নির্দেশ দিয়েছেন চাগোস দ্বীপপুঞ্জের জন্য একটি ‘অফার’ তৈরি করতে। তিনি মনে করেন, গ্রিনল্যান্ডের মতো চাগোস দ্বীপপুঞ্জও যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত নিরাপত্তার জন্য অপরিহার্য। অন্যদিকে, মরিশাস সরকার ট্রাম্পের এই মন্তব্যকে তাদের সার্বভৌমত্বের ওপর হস্তক্ষেপ বলে অভিহিত করেছে।
ইউরোপীয় দেশগুলো ট্রাম্পের এই একের পর এক দ্বীপ বা ভূখণ্ড দখলের আগ্রহকে ‘আধুনিক উপনিবেশবাদ’ হিসেবে দেখছে। ডেনমার্কের এমপির ট্রাম্পকে গালি দেওয়ার ঘটনার পর ব্রিটিশ পার্লামেন্টেও ট্রাম্পের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের ঝড় ওঠার সম্ভাবনা দেখা দিচ্ছে।
ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই নতুন দাবি প্রমাণ করে যে, তিনি তাঁর দ্বিতীয় মেয়াদে প্রথাগত কূটনীতির চেয়ে ‘টেরিটোরিয়াল গেইন’ বা ভূখণ্ড অর্জনকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন। চাগোস দ্বীপপুঞ্জ নিয়ে তাঁর এই জেদ শেষ পর্যন্ত লন্ডন-ওয়াশিংটন সম্পর্কের দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতি করে কি না, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের এই মন্তব্য কেবল চাগোস দ্বীপপুঞ্জ নিয়ে নয়, এটি ব্রিটিশ রাজপরিবারের আসন্ন মার্কিন সফরের ওপরও কালো মেঘের ছায়া ফেলবে।