প্রকাশিত:
২১ জানুয়ারী, ২০২৬

অস্ট্রেলিয়ার পূর্ব উপকূলে যেন বিভীষিকা নেমে এসেছে। মাত্র ৪৮ ঘণ্টার ব্যবধানে পৃথক চারটি হাঙর আক্রমণের ঘটনায় সিডনিসহ নিউ সাউথ ওয়েলস (NSW) অঙ্গরাজ্যের উপকূলীয় অঞ্চলে চরম উত্তেজনা ও আতঙ্ক বিরাজ করছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সিডনির জনপ্রিয় ম্যানলি ও বন্ডাই বিচসহ অন্তত এক ডজন সমুদ্রসৈকত অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করেছে কর্তৃপক্ষ।
মঙ্গলবার সকালে সিডনি থেকে ৪০০ কিলোমিটার উত্তরে পোর্ট ম্যাকোয়ারির কাছে সার্ফিং করার সময় এক ব্যক্তি হাঙরের কামড়ে আহত হন। বর্তমানে তিনি হাসপাতালে আছেন। এর আগে সোমবার সন্ধ্যায় সিডনির ম্যানলি বিচে এক তরুণ সার্ফারকে কামড়ে দেয় হাঙর। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, অন্য এক সার্ফার নিজের সার্ফবোর্ডের রশি ব্যবহার করে রক্তক্ষরণ বন্ধ করতে পারায় তার প্রাণ বেঁচে যায়। বর্তমানে তিনি গুরুতর অবস্থায় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
ঘটনার শুরু গত রবিবার বিকেলে। সিডনি হারবারের ভকলুস এলাকায় বন্ধুদের সাথে আনন্দ করার সময় ১২ বছরের এক কিশোর হাঙরের কবলে পড়ে। বন্ধুদের অসীম সাহসিকতায় কিশোরটিকে উদ্ধার করা গেলেও তার দুই পা মারাত্মকভাবে জখম হয়েছে। বর্তমানে সে সিডনি চিলড্রেন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
এর ঠিক ২৪ ঘণ্টা কাটতে না কাটতেই ডি হোয়াই বিচে ১১ বছরের এক স্কুলপড়ুয়া শিশুর ওপর আক্রমণ চালায় একটি বড় হাঙর। সৌভাগ্যবশত শিশুটি প্রাণে বেঁচে গেলেও তার সার্ফবোর্ডটি হাঙরের কামড়ে দ্বিখণ্ডিত হয়ে যায়। এরপর সোমবার সন্ধ্যায় ম্যানলি বিচে এক তরুণ সার্ফার এবং মঙ্গলবার সকালে পোর্ট ম্যাকোয়ারিতে ৩৯ বছর বয়সী এক ব্যক্তি আক্রমণের শিকার হন। পরপর এই চার হামলার ঘটনা সিডনির শান্ত উপকূলে রুদ্ধশ্বাস পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে।
সার্ফ লাইফ সেভিং এনএসডাব্লিউ-এর প্রধান নির্বাহী স্টিভেন পিয়ার্স সতর্ক করে বলেছেন, বর্তমানে সমুদ্রের পানির গুণমান খুবই খারাপ, যা হাঙরের উপস্থিতির জন্য সহায়ক। আমরা সবাইকে সমুদ্রের পরিবর্তে স্থানীয় সুইমিং পুল ব্যবহারের পরামর্শ দিচ্ছি।
সামুদ্রিক জীববিজ্ঞানীদের মতে, গত কয়েক দিনের ভারি বৃষ্টিপাত এবং ঘোলাটে পানি এই বিপত্তির প্রধান কারণ। বৃষ্টির তোড়ে নদী থেকে মাছ ও অন্যান্য খাবার সাগরে মিশছে, যা হাঙরকে তীরের কাছে টেনে আনছে। বিশেষ করে ‘বুল শার্ক’ বা ষাঁড়-হাঙর ঘোলা পানিতে শিকার করতে পছন্দ করে। দৃশ্যমানতা কম থাকায় তারা ভুলবশত মানুষকে শিকার হিসেবে আক্রমণ করছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
অস্ট্রেলিয়ায় বছরে গড়ে ২০টি হাঙরের আক্রমণের ঘটনা ঘটলেও প্রাণহানির সংখ্যা থাকে খুবই কম (গড়ে ৩টিরও নিচে)। তবে বর্তমান পরিস্থিতিকে ‘নজিরবিহীন’ বলে আখ্যা দিয়েছে প্রশাসন। উপকূলীয় এলাকায় ড্রোন টহল বাড়ানো হয়েছে এবং পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত লাল পতাকা টাঙিয়ে সাধারণ মানুষকে সতর্ক করা হচ্ছে।
সৈকতগুলো বন্ধ করে দেওয়ার পাশাপাশি আকাশপথে ড্রোন এবং হেলিকপ্টার দিয়ে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। ড্রোনের ক্যামেরায় সিডনি উপকূলে বেশ কিছু বড় আকৃতির হাঙরের উপস্থিতি ধরা পড়েছে। সার্ফ লাইফ সেভিং এনএসডব্লিউ-এর কর্মকর্তা স্টিভেন পিয়ার্স পর্যটকদের সতর্ক করে বলেছেন, "পানির বর্তমান অবস্থা হাঙরের উপস্থিতির জন্য একদম উপযুক্ত। দয়া করে কেউ প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে সাগরে নামবেন না।"
অস্ট্রেলিয়ায় এখন গ্রীষ্মকাল এবং পর্যটনের ভরা মৌসুম। এই সময়ে সৈকতগুলো বন্ধ থাকায় সিডনির পর্যটন ব্যবসায় ধস নামার আশঙ্কা করা হচ্ছে। অনেক পর্যটকই তাদের বুকিং বাতিল করে হোটেল ছেড়ে চলে যাচ্ছেন।