প্রকাশিত:
১৩ জানুয়ারী, ২০২৬

মোদি সরকার ভারতনিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরে দুই মাসের জন্য ভিপিএন ব্যবহারের ওপর পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা জারি করে। কারণ হিসেবে ‘জাতীয় নিরাপত্তার হুমকি’ এবং ‘অশান্তি উসকে দিতে’ এই পরিষেবার অপব্যবহারের কথা উল্লেখ করা হয়।
সরকার দাবি করেছে, কাশ্মীরে ‘বেআইনি ও দেশবিরোধী কর্মকাণ্ডে’ ভিপিএন ব্যবহৃত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, যার মধ্যে উসকানিমূলক ও ভুল তথ্য প্রচার এবং জনশৃঙ্খলার জন্য ক্ষতিকর অন্যান্য কাজ অন্তর্ভুক্ত।
নতুন এই নির্দেশ জারির পর থেকে কাশ্মীরের পুলিশ বিভাগ কঠোর অবস্থানে রয়েছে। বিভিন্ন স্থানে তল্লাশি চৌকি বসিয়ে পথচারী ও গাড়িচালকদের মুঠোফোন পরীক্ষা করার খবর পাওয়া গেছে।
কাশ্মীরের তথ্যপ্রযুক্তি (IT) খাতের পেশাদাররা চরম বিপাকে পড়েছেন। অনেক কর্পোরেট ই-মেইল বা সংবেদনশীল ডেটা হ্যান্ডেল করতে ভিপিএন অত্যাবশ্যক। পুলওয়ামার এক আইটি কর্মী আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন যে, এই নিষেধাজ্ঞার ফলে তিনি চাকরি হারাতে পারেন।
সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে কর্মরত সাংবাদিকরা নিজেদের সুরক্ষার স্তর হিসেবে ভিপিএন ব্যবহার করেন। নিষেধাজ্ঞার ফলে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন তৈরির কাজ প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে।
প্রকাশিত সংবাদ অনুযায়ী, ২৯ ডিসেম্বর থেকে এখন পর্যন্ত নিষেধাজ্ঞা অমান্য করার অভিযোগে উপত্যকায় কয়েকশ মানুষের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
ইতিমধ্যে অন্তত ১৫০ থেকে ৮০০ জনের বিরুদ্ধে নতুন ‘ভারতীয় নাগরিক সুরক্ষা সংহিতা (BNSS)’ আইনের আওতায় মামলা বা আইনি প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
শ্রীনগর, কুলগাম, সোপিয়ান ও পুলওয়ামার মতো জেলাগুলোতে পুলিশ মোবাইল ফোন আনলক করে অ্যাপ পরীক্ষা করছে, যা ডিজিটাল অধিকার কর্মীদের মতে ব্যক্তিগত অধিকারের চরম লঙ্ঘন।
২ জানুয়ারি পুলিশের এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘সঠিক ব্যবহারকারীদের ডিভাইস বিস্তারিত বিশ্লেষণের পর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে এবং ভবিষ্যতে ভিপিএন ব্যবহার থেকে বিরত থাকতে কঠোর সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছে।’
ভারতের ৮০ কোটি ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর মধ্যে প্রায় ২০ শতাংশ ভিপিএন ব্যবহার করেন। আমস্টারডামভিত্তিক সাইবার নিরাপত্তা কোম্পানি ‘সার্ফশার্ক’-এর মতে, ভারতে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি ভিপিএন ব্যবহারকারী রয়েছেন। এর বাজারমূল্য ১ হাজার ৭০০ কোটি ডলার।
আহমদ নামের স্থানীয় এক আইনজীবী (ভয়ে পুরো নাম বলতে চাননি) আল-জাজিরাকে বলেন, এই ভিপিএন নিষেধাজ্ঞা বেআইনি হতে পারে। তিনি আরও বলেন, ‘এই আদেশের বৈধতা সন্দেহজনক। কারণ, এটি ভারতের আইটি নীতিমালার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ হতে হবে। ওই নীতিমালায় ঢালাওভাবে ভিপিএন নিষিদ্ধ করার কথা বলা নেই।’
মানবাধিকার সংস্থাগুলো এই পদক্ষেপকে ‘ডিজিটাল স্বৈরশাসন’ হিসেবে অভিহিত করেছে। তাদের মতে, কাশ্মীরের জনগণকে বহির্বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন রাখতেই এই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। উল্লেখ্য, ২০১২ সাল থেকে ভারতে হওয়া মোট ৯০০-এর বেশি ইন্টারনেট শাটডাউনের প্রায় অর্ধেকই ঘটেছে এই কাশ্মীর উপত্যকায়।
সরকার বলছে এই নিষেধাজ্ঞা সাময়িক, কিন্তু স্থানীয়রা একে দেখছেন দমন-পীড়নের নতুন অস্ত্র হিসেবে। ভিপিএন ব্যবহারের মতো সাধারণ কাজ করতে গিয়েও আইনি ঝুঁকির মুখে পড়া কাশ্মীরের সাধারণ নাগরিকদের মধ্যে নতুন করে আতঙ্ক ও মানসিক চাপ তৈরি করেছে।