প্রকাশিত:
গতকাল

মাঝ সমুদ্রে নৌকাডুবির পর পরিবারের অন্য সদস্যদের নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচাতে টানা ৪ ঘণ্টা সমুদ্রের ঢেউয়ের সঙ্গে লড়াই করে সাঁতরে তীরে পৌঁছায় সে। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতেই পরবর্তীতে কোস্টগার্ড এসে সমুদ্রের মাঝখানে ভেসে থাকা তার বাবা-মা ও ছোট বোনকে জীবিত উদ্ধার করে।এ ঘটনার জন্য উদ্ধারকারীরা এক কিশোরের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। ঘটনাটি ঘটে পশ্চিম অস্ট্রেলিয়ার পর্যটন শহরের কুইন্ডালুপের কাছে।
প্রচণ্ড ঢেউ ও ঝোড়ো বাতাসের তোড়ে তাদের ছোট নৌকাটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে উল্টে যায়। লাইফ জ্যাকেট না থাকায় এবং অন্ধকার ঘনিয়ে আসায় মাঝ সমুদ্রে বাঁচার আশা প্রায় ছেড়ে দিয়েছিলেন সবাই।কায়াকিং ও প্যাডেলবোর্ডিং করার সময় তার মা এবং দুই ছোট ভাইবোন সমুদ্রে ভেসে গেলে ১৩ বছর বয়সী ওই কিশোরটি প্রায় চার কিলোমিটার (২.৫ মাইল) সাঁতার কেটে তীরে পৌঁছাতে সক্ষম হয়।
নৌকাটি ডুবে যাওয়ার পর তার বাবা-মা একটি কাঠের টুকরো আঁকড়ে ছোট বোনকে কোনোমতে ভাসিয়ে রাখার চেষ্টা করছিলেন। কিশোরটি বুঝতে পারে, সাহায্যের জন্য কেউ না আসলে সবাই ডুবে মারা যাবে। অদম্য সাহসে সে সিদ্ধান্ত নেয় তীরের সন্ধানে সাঁতার দেওয়ার। উত্তাল ঢেউ, প্রচণ্ড শীত আর নোনা জলের ঝাপটা উপেক্ষা করে সে দীর্ঘ ৪ ঘণ্টা অবিরাম সাঁতার কাটে। উদ্ধারকারীরা খোলা সমুদ্রে একটি প্যাডেলবোর্ডে আঁকড়ে থাকা অবস্থায় তার মা ও ভাইবোনদের খুঁজে পান।
রাত তখন প্রায় ১০টা। ক্লান্ত-বিপর্যস্ত অবস্থায় কিশোরটি যখন সমুদ্রতটে এসে পৌঁছায়, তখন সে প্রায় অচেতন। স্থানীয় জেলেরা তাকে উদ্ধার করলে সে কোনোমতে আঙুল উঁচিয়ে সমুদ্রের দিকে ইঙ্গিত করে পরিবারের বিপদের কথা জানায়। কালক্ষেপণ না করে স্থানীয় প্রশাসন ও কোস্টগার্ড উদ্ধার অভিযানে নামে।
জিপিএস ট্র্যাকিং এবং কিশোরের দেওয়া বর্ণনা অনুযায়ী আনুমানিক রাত ১২টায় উদ্ধারকারী দলটির হেলিকপ্টার সমুদ্রের প্রায় ১৪ কিলোমিটার দূরে একটি প্যাডেলবোর্ডে আঁকড়ে থাকা অবস্থায় ছেলেটির ৪৭ বছর বয়সী মা, ১২ বছরের ভাই ও ৮ বছরের বোনকে খুঁজে পায়। পরে একটি স্বেচ্ছাসেবী সামুদ্রিক উদ্ধার নৌযান সেখানে গিয়ে তিনজনকেই নিরাপদে উদ্ধার করে তীরে নিয়ে আসে।
পুলিশ পরিদর্শক জেমস ব্র্যাডলি বলেন, "একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের জন্যও এমন উত্তাল সমুদ্রে ৪ ঘণ্টা সাঁতার কাটা প্রায় অসম্ভব। এই কিশোর যা করেছে তা সাহসিকতার চরম উদাহরণ। সে হাল ছাড়লে আজ পুরো পরিবারটি সলিল সমাধি হতো।"
ন্যাচারালিস্ট ভলান্টিয়ার মেরিন রেসকিউ গ্রুপ এক বিবৃতিতে জানায়, ‘এই পরিবারের সাহস, শক্তি ও দৃঢ়তা ছিল অসাধারণ—বিশেষ করে ওই তরুণটির, যে ৪ কিলোমিটার সাঁতার কেটে সাহায্যের সংকেত দিতে সক্ষম হয়।’
উদ্ধারের পর পরিবারের সবাইকে প্যারামেডিকরা পরীক্ষা করেন এবং পরে তাদের কাছের একটি হাসপাতালে নেওয়া হয়। এবিসির খবরে বলা হয়েছে, পরে তারা হাসপাতাল থেকে ছাড়া পান এবং উদ্ধারকর্মীদের কাছে গিয়ে ধন্যবাদ জানান।
কিশোরটির এই অসীম বীরত্ব এখন লোকমুখে ছড়িয়ে পড়েছে। স্থানীয় প্রশাসন তার এই সাহসিকতার জন্য তাকে বিশেষ বীরত্ব পুরস্কার দেওয়ার সুপারিশ করেছে। জীবনের কঠিনতম সময়ে হাল না ছাড়ার এই গল্প আমাদের শেখায়—ইচ্ছাশক্তি থাকলে যমদূতকেও হার মানানো সম্ভব।