প্রকাশিত:
১৮ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬

ফুটবল মাঠে আর্জেন্টিনা বিশ্বসেরা হলেও অর্থনীতির ময়দানে দেশটি এখন খাদের কিনারায়। লাতিন আমেরিকার এই দেশটিতে মূল্যস্ফীতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, চাল, ডাল, মাংসের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য কিনতে সাধারণ মানুষকে ক্রেডিট কার্ড বা চড়া সুদে ব্যক্তিগত ঋণের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। মধ্যবিত্ত থেকে নিম্নবিত্ত—সবার জীবনই এখন ধারদেনার জালে বন্দি।
বুয়েনস আইরেসের গ্র্যান্ডে ইনস্টিটিউটের সাম্প্রতিক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, দেশটির প্রায় অর্ধেক মানুষ এখন সঞ্চয় ভেঙে অথবা ধার করে সংসার চালাচ্ছেন। ৪৩ বছর বয়সি বিক্রেতা দিয়েগো নাকাশিওর মতো অনেকেই জানিয়েছেন, মাসের ১৫ তারিখের মধ্যেই তাদের বেতন শেষ হয়ে যায় এবং মাসের বাকি দিনগুলোতে খাবারের খরচ মেটাতে তাদের ছোটখাটো ঋণ বা বাড়তি কাজের ওপর নির্ভর করতে হয়।
আর্জেন্টিনায় বর্তমান মূল্যস্ফীতির হার ২০০ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে, যা গত কয়েক দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ।
সুপারমার্কেটগুলোতে প্রতিদিন জিনিসের দাম বাড়ছে। সকালে যে রুটি বা দুধের দাম একরকম থাকে, বিকেলে তা বেড়ে যাচ্ছে।মানুষের বেতন বা আয় যে হারে বাড়ছে, নিত্যপণ্যের দাম বাড়ছে তার চেয়ে কয়েক গুণ দ্রুত গতিতে। ফলে মাস শেষে সঞ্চয় তো দূরের কথা, ১০ দিনের মাথায় পকেট খালি হয়ে যাচ্ছে।
আর্জেন্টিনার স্থানীয় সংবাদমাধ্যমগুলোর তথ্যমতে, দেশটির অর্ধেকের বেশি মানুষ এখন তাদের ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করছেন কেবল মুদি দোকান বা কাঁচাবাজারের খরচ মেটাতে।
অনেক সুপারমার্কেট এখন কিস্তিতে (Installments) খাবার কেনার সুযোগ দিচ্ছে। মানুষ আজকের রাতের খাবার কিনছেন যা আগামী তিন বা ছয় মাস ধরে শোধ করতে হবে।অনেক পরিবার তাদের ব্যবহৃত আসবাবপত্র বা গয়না বন্ধক রেখে খাবারের টাকা জোগাড় করছেন।
নভেম্বরের তথ্য অনুযায়ী ব্যাংকিং ও কৃষি খাতে প্রবৃদ্ধি দেখা গেলেও উৎপাদন এবং খুচরা বিক্রয় খাতে ব্যাপক ধস নেমেছে। স্বাধীন খুচরা বিক্রেতাদের মতে, মানুষের খাদ্যদ্রব্য ক্রয়ের পরিমাণ ১২.৫ শতাংশ কমে গেছে। বিশেষ করে বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দাম মুদ্রাস্ফীতির হারের চেয়েও বহুগুণ বৃদ্ধি পাওয়ায় সাধারণ মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা মারাত্মকভাবে হ্রাস পেয়েছে।
প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলেই ক্ষমতা গ্রহণের পর অর্থনীতির সংস্কারে কিছু কঠোর পদক্ষেপ (Shock Therapy) নিয়েছেন। ভর্তুকি কমানো এবং মুদ্রার মান কমিয়ে দেওয়ায় স্বল্পমেয়াদে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি আরও বেড়েছে। যদিও সরকার দাবি করছে এটি দীর্ঘমেয়াদী সুফল আনবে, কিন্তু ক্ষুধার্ত মানুষের ধৈর্য এখন শেষ সীমায়।
অর্থনীতিবিদ লুসিয়া ক্যাভালেরো এই পরিস্থিতিকে একটি বড় সংকট হিসেবে অভিহিত করেছেন। তিনি মনে করেন, কেবল ঋণ দিয়ে বা কিস্তি সুবিধা বাড়িয়ে এই সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন কাঠামোগত পরিবর্তন এবং মজুরি বৃদ্ধি, যাতে তা নিত্যপণ্যের দামের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়।
ফুটবল মাঠের জয় আর মাঠের বাইরের এই পরাজয় আর্জেন্টিনার জন্য এক চরম বৈপরীত্য। যে দেশটি একসময় বিশ্বের অন্যতম সমৃদ্ধ দেশ ছিল, আজ সেই দেশের মানুষকে কেবল বেঁচে থাকার জন্য ঋণের বোঝা বইতে হচ্ছে। আন্তর্জাতিক মহলের সহায়তা এবং অভ্যন্তরীণ সঠিক নীতি ছাড়া এই খাদ থেকে উঠে আসা আর্জেন্টিনার জন্য প্রায় অসম্ভব।
আর্জেন্টিনার এই সংকট কেবল সেই দেশের নয়, বরং পুরো লাতিন আমেরিকার অর্থনীতির জন্য একটি সতর্কবার্তা।