প্রকাশিত:
২১ জানুয়ারী, ২০২৬

আটলান্টিক মহাসাগরের দুই তীরের সামরিক জোট ন্যাটোর ওপর থেকে নির্ভরশীলতা কমানোর প্রতিশ্রুতি রক্ষায় বড় পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। পেন্টাগন ও হোয়াইট হাউসের উচ্চপদস্থ সূত্রের খবর অনুযায়ী, ইউরোপে অবস্থিত ন্যাটোর প্রধান কমান্ড সেন্টার এবং কার্যালয়গুলো থেকে কয়েক হাজার মার্কিন সামরিক ও বেসামরিক কর্মী ছাঁটাই বা প্রত্যাহারের পরিকল্পনা করা হচ্ছে।
ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে চলতি সপ্তাহে তিনটি সূত্র জানিয়েছে, ট্রাম্প প্রশাসন ইউরোপের কয়েকটি দেশকে ইতোমধ্যে বিষয়টি অবহিত করেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কূটনৈতিক সূত্রগুলোর দাবি, ন্যাটোর বিভিন্ন কমান্ড সেন্টার থেকে প্রায় ২০০ জন মার্কিন কর্মী প্রত্যাহার করা হতে পারে। এসব সেন্টার মূলত সামরিক ও গোয়েন্দা কার্যক্রম তদারকি এবং কৌশলগত পরিকল্পনার দায়িত্বে রয়েছে।
ট্রাম্প প্রশাসনের এই পদক্ষেপের মূল উদ্দেশ্য হলো ইউরোপীয় দেশগুলোকে তাদের নিজেদের নিরাপত্তার জন্য আরও বেশি খরচ করতে বাধ্য করা। ট্রাম্প দীর্ঘদিন ধরেই অভিযোগ করে আসছেন যে, ন্যাটোর ব্যয়ের সিংহভাগ বহন করছে যুক্তরাষ্ট্র, অথচ ইউরোপের ধনী দেশগুলো প্রতিরক্ষা বাজেটে তাদের লক্ষ্যমাত্রা (জিডিপির ২%) পূরণ করছে না। কমান্ড সেন্টারগুলো থেকে কর্মী কমানোর মাধ্যমে ট্রাম্প স্পষ্ট বার্তা দিতে চান—'আমেরিকা আর ইউরোপের নিরাপত্তার পাহারাদার হয়ে থাকবে না'।
এরই মধ্যে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ন্যাটোকে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ‘হুমকি’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। সুইজারল্যান্ডে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামে যোগ দেওয়ার আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে তিনি চীন ও রাশিয়াকে ‘বুগিম্যান’ হিসেবে উল্লেখ করেন এবং ন্যাটোর ভূমিকা নিয়ে সমালোচনা করেন।
ন্যাটো কর্মকর্তারা অবশ্য বিষয়টিকে স্বাভাবিক বলেই দেখছেন। রয়টার্সকে ন্যাটোর এক কর্মকর্তা জানান, যুক্তরাষ্ট্রের জনবল ব্যবস্থাপনায় এটি অস্বাভাবিক কিছু নয় এবং বর্তমানে ইউরোপে আগের তুলনায় বেশি সংখ্যক মার্কিন কর্মকর্তা দায়িত্ব পালন করছেন।
এ বিষয়ে হোয়াইট হাউজ ও পেন্টাগনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তারা কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি।
ট্রাম্পের এই পরিকল্পনায় ব্রাসেলস এবং বার্লিনে আতঙ্কের সৃষ্টি হয়েছে। ন্যাটোর কর্মকর্তারা মনে করছেন, এই মুহূর্তে মার্কিন উপস্থিতি কমিয়ে দিলে তা রাশিয়ার জন্য একটি ইতিবাচক সংকেত হবে। বিশেষ করে ইউক্রেন যুদ্ধ যখন একটি অনিশ্চিত অবস্থায় রয়েছে, তখন মার্কিন কমান্ডারের অনুপস্থিতিতে জোটের সমন্বয় ব্যবস্থা ভেঙে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন অনেক সামরিক বিশ্লেষক।
হোয়াইট হাউসের প্রেস সচিব এক বিবৃতিতে জানিয়েছেন, “প্রেসিডেন্ট মনে করেন মার্কিন করদাতাদের অর্থ বিদেশের মাটিতে সীমাহীনভাবে ব্যয় করার দিন শেষ। আমরা ন্যাটো থেকে পুরোপুরি বেরিয়ে যাচ্ছি না, তবে আমরা জোটের ভেতরে নিজেদের দায়ভার পুনর্নির্ধারণ করছি।” এই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে অনেক মার্কিন সেনাকে প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে (ইন্দো-প্যাসিফিক) স্থানান্তর করা হতে পারে, যেখানে চীনকে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখছে ওয়াশিংটন।
এই সিদ্ধান্ত এমন এক সময়ে এলো, যখন ৭৭ বছরের ইতিহাসে ন্যাটো সবচেয়ে জটিল কূটনৈতিক পরিস্থিতির মুখোমুখি। ট্রাম্প এর আগে ন্যাটো থেকে বেরিয়ে যাওয়ার হুমকি দিয়েছিলেন এবং প্রতিরক্ষা ব্যয় নিয়ে ইউরোপীয় দেশগুলোর সমালোচনা করেছিলেন।
যদিও ২০২৫ সালের মাঝামাঝি সময়ে ইউরোপীয় দেশগুলো প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়াতে সম্মত হলে ট্রাম্প ন্যাটো মহাসচিব ও ইউরোপীয় নেতাদের প্রশংসা করেছিলেন, তবে সাম্প্রতিক সিদ্ধান্তগুলো আবারও ইউরোপজুড়ে অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ন্যাটোর ভেতরে কোনো ধরনের আঞ্চলিক আগ্রাসন বা অভ্যন্তরীণ বিভাজন জোটটির অস্তিত্বের জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠতে পারে।
কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এটি ট্রাম্পের একটি ‘লিভারেজ’ বা দরাদরি করার হাতিয়ার। তিনি হয়তো শেষ পর্যন্ত সব কর্মী সরাবেন না, তবে ইউরোপীয় দেশগুলোকে প্রতিরক্ষা বাজেট বাড়ানোর জন্য সর্বোচ্চ চাপে রাখতে এই কার্ডটি ব্যবহার করছেন।