প্রকাশিত:
২ ঘন্টা আগে

পেশায় পোশাক ব্যবসায়ী এরফান সোলতানিকে গত ৮ জানুয়ারি তেহরানের কাছে ফারদিস শহর থেকে গ্রেফতার করা হয়। অভিযোগ ছিল, তিনি দেশটিতে চলমান সরকারবিরোধী আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়েছেন। গ্রেফতারের মাত্র তিন দিনের মাথায় কোনো প্রকার স্বচ্ছ বিচারিক প্রক্রিয়া ছাড়াই তাকে ‘মোহরেবেহ’ বা ‘ঈশ্বরের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’ করার অপরাধে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়।
বিশ্বজুড়ে মানবাধিকার সংস্থাগুলোর তীব্র প্রতিবাদ এবং যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশগুলোর কড়া হুঁশিয়ারির মুখে তরুণ বিক্ষোভকারী এরফান সোলতানির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর সাময়িকভাবে স্থগিত করেছে ইরান। নির্ধারিত সময়ে ফাঁসি কার্যকর না হওয়ায় আপাতত প্রাণরক্ষা পেলেন ২৬ বছর বয়সী এই যুবক।
গ্রেপ্তার হওয়ার পর থেকে এরফানের পরিবার তাঁর অবস্থা সম্পর্কে খুব কমই জানতে পেরেছিল। শুধু মৃত্যুদণ্ডের আগে শেষবিদায় হিসেবে সংক্ষিপ্ত একটি সাক্ষাতের সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। তবে গতকাল মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের নির্ধারিত সময়ের কয়েক ঘণ্টা পর কারাগার কর্তৃপক্ষ এরফানের পরিবারকে ফোন করে জানায় যে এটি স্থগিত করা হয়েছে; যদিও এর কোনো বিস্তারিত কারণ জানানো হয়নি।
এই মৃত্যুদণ্ডকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছিল বিশ্বজুড়ে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এক বিবৃতিতে ইরানকে সতর্ক করে বলেছিলেন, যদি বিক্ষোভকারীদের ওপর এই অন্যায় মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়, তবে ইরানকে “কঠোর পরিণাম” ভোগ করতে হবে। পরবর্তীতে ট্রাম্প জানান যে, তিনি নির্ভরযোগ্য সূত্রে আশ্বস্ত হয়েছেন যে ইরান আপাতত ফাঁসি কার্যকর থেকে সরে এসেছে।
অন্যদিকে, অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল একে ‘বিচারের নামে প্রহসন’ বলে অভিহিত করেছে। তাদের দাবি, এরফানকে কোনো আইনজীবী নিয়োগ করতে দেওয়া হয়নি এবং তার বোন একজন পেশাদার আইনজীবী হওয়া সত্ত্বেও তাকে মামলায় অংশ নিতে বাধা দেওয়া হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংস্থা হিউম্যান রাইটস অ্যাকটিভিস্টস নিউজ এজেন্সির (এইচআরএএনএ) তথ্যমতে, ইরানে গত দুই সপ্তাহে ১৮ হাজারের বেশি মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং অন্তত ২ হাজার ৫৭১ জন নিহত হয়েছেন।
মুদ্রার মানের আকস্মিক পতনের পর গত ২৮ ডিসেম্বর ইরানে বিক্ষোভ শুরু হয়। পরে এ বিক্ষোভ দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে এবং রাজনৈতিক সংস্কারের দাবিতে রূপ নেয়।
মানবাধিকার পর্যবেক্ষকেরা জানিয়েছেন, ইরান প্রায়ই কয়েক মিনিটের সংক্ষিপ্ত বিচারের মাধ্যমে বিক্ষোভকারীদের দণ্ডাদেশ দিয়ে থাকে। এরফানকে গ্রেপ্তার করার মাত্র চার দিন পরই মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়, যা ইরানি মানবাধিকারকর্মীদের মতে তাঁকে যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া থেকে বঞ্চিত করার শামিল।
নরওয়েভিত্তিক সংস্থা ইরান হিউম্যান রাইটসের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর ইরান কমপক্ষে ১ হাজার ৫০০ জনের ফাঁসি কার্যকর করেছে।
গতকাল সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেন, ইরানে বিক্ষোভকারীদের হত্যা বন্ধ করা হয়েছে বলে তাঁকে আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। বিক্ষোভকারীদের মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার পরিকল্পনাও স্থগিত করা হয়েছে।
ইরান ইস্যুতে মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ার মধ্যে কাতারের মার্কিন সামরিক ঘাঁটি থেকে কিছু সেনা সরিয়ে নেওয়ার বিষয়ে গতকাল ঘোষণা দিয়েছে ওয়াশিংটন। এর কয়েক ঘণ্টা পর সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে ট্রাম্প এসব কথা বলেন।
ইরানে অর্থনৈতিক সংকট ও মুদ্রাস্ফীতির প্রতিবাদে শুরু হওয়া এই আন্দোলন বর্তমানে রাজনৈতিক রূপ নিয়েছে। দেশটিতে চলমান ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউটের মধ্যেও বিভিন্ন শহর থেকে বিক্ষোভের খবর পাওয়া যাচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এরফান সোলতানির ফাঁসি স্থগিত হওয়া আন্দোলনকারীদের জন্য একটি বড় নৈতিক বিজয়।