প্রকাশিত:
২ ঘন্টা আগে

দেশের ব্যাংক খাতে শৃঙ্খলা ফেরাতে একীভূত হওয়া পাঁচটি ইসলামী ব্যাংকের প্রায় ৭৫ লাখ গ্রাহক বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন। ব্যাংকগুলোর পুঞ্জীভূত লোকসান সমন্বয় করতে ২০২৪ এবং ২০২৫—এই দুই বছরের কোনো মুনাফা পাবেন না আমানতকারীরা। আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং পরিভাষায় একে ‘হেয়ারকাট’ (Haircut) বা আমানতের অংশ কর্তন বলা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক রীতি অনুসরণ করেই বাংলাদেশ ব্যাংক আমানতকারীদের এই দুই বছরের মুনাফা ‘হেয়ারকাট’ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এর ফলে আমানতের একটি অংশ কেটে রাখা হবে, যা একীভূতকরণ প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে কার্যকর করা হবে।
বুধবার (১৪ জানুয়ারি) পাঁচটি ব্যাংকের প্রশাসকের কাছে এ বিষয়ে চিঠি পাঠিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। পাশাপাশি ব্যাংকগুলোর সব আমানতকারীর হিসাব নতুন করে গণনার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, বিশ্বজুড়ে ব্যাংক একীভূতকরণের সময় এ ধরনের হেয়ারকাট পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়। একই নীতির আলোকে বাংলাদেশেও এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
সহজ কথায়, ব্যাংক যখন চরম সংকটে পড়ে এবং আমানতকারীদের সম্পূর্ণ টাকা ফেরত দেওয়ার ক্ষমতা হারায়, তখন আমানতের কিছু অংশ বা মুনাফা কেটে রাখা হয়। একেই বলা হয় ‘হেয়ারকাট’। সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের ক্ষেত্রে গ্রাহকরা তাদের মূল টাকা (Principal Amount) নিরাপদ থাকলেও, গত দুই বছরে সেই টাকার ওপর অর্জিত কোনো অতিরিক্ত লাভ বা মুনাফা পাচ্ছেন না।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তদারকিতে সম্প্রতি পাঁচটি ইসলামী ব্যাংক একীভূত হয়ে ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক পিএলসি’ (Combined Islamic Bank PLC) হিসেবে নতুন যাত্রা শুরু করেছে। ব্যাংকগুলো হলো: ১. ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক ২. সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক (SIBL) ৩. ইউনিয়ন ব্যাংক ৪. গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক ৫. এক্সিম ব্যাংক
এসব ব্যাংকের দায়, সম্পদ ও জনবল নবগঠিত সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের মাধ্যমে অধিগ্রহণ করা হচ্ছে। একীভূতকরণ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলে ধীরে ধীরে এই পাঁচ ব্যাংক বিলুপ্ত হয়ে যাবে। ব্যাংক রেজুলেশন ডিপার্টমেন্ট থেকে পাঠানো চিঠিতে বলা হয়েছে, ব্যাংক খাতে চলমান ‘ব্যাংক রেজুলেশন স্কিম’ বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে সব আমানত হিসাবের স্থিতি পুনর্গণনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
এ সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ১ জানুয়ারি ২০২৪ থেকে ২৮ ডিসেম্বর ২০২৫ পর্যন্ত সময়ের জন্য আমানতের ওপর কোনো মুনাফা গণনা করা হবে না এবং নির্ধারিত হেয়ারকাট প্রয়োগ করে চূড়ান্ত স্থিতি নির্ধারণ করা হবে। রেজুলেশন স্কিমের অভিন্ন ও সুষ্ঠু বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে এই পুনর্গণনা প্রক্রিয়া দ্রুত শেষ করার জন্য ব্যাংকগুলোকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এই সিদ্ধান্তের ফলে ক্ষুদ্র আমানতকারী এবং বিশেষ করে যারা মাসিক মুনাফাভিত্তিক (DPS/FDR) স্কিমের ওপর নির্ভরশীল ছিলেন, তারা চরম বিপাকে পড়েছেন। গ্রাহকদের অনেকে অভিযোগ করেছেন যে, ব্যাংকের অসাধু মালিক ও কর্মকর্তাদের দুর্নীতির দায় এখন সাধারণ মানুষের কাঁধে চাপানো হচ্ছে। তবে ব্যাংকিং বিশেষজ্ঞদের মতে, ব্যাংকগুলো পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাওয়ার চেয়ে আমানতের অংশ ত্যাগ করে হলেও ব্যাংক বাঁচিয়ে রাখা গ্রাহকদের জন্যই দীর্ঘমেয়াদে ভালো।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র জানিয়েছেন, ব্যাংকগুলোর স্বাস্থ্য পুনরুদ্ধারে এই কঠোর সিদ্ধান্ত অপরিহার্য ছিল। তিনি আশ্বস্ত করেছেন যে, ২০২৬ সাল থেকে আমানতকারীরা নিয়মিত মুনাফা পাবেন এবং বর্তমানে তাদের মূল আমানত সম্পূর্ণ নিরাপদ রয়েছে। ব্যাংকটির নতুন নাম ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক’ হিসেবে এখন থেকে গ্রাহকরা সব ধরনের লেনদেন আগের মতোই করতে পারবেন।
বাংলাদেশ ব্যাংক ঘোষিত স্কিম অনুযায়ী, পাঁচটি ইসলামী ব্যাংক একীভূত করে গঠিত নতুন ব্যাংকটির অনুমোদিত মূলধন নির্ধারণ করা হয়েছে ৪০ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে পরিশোধিত মূলধন হবে ৩৫ হাজার কোটি টাকা।