প্রকাশিত:
১৮ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬

জাতীয় নিরাপত্তার দোহাই দিয়ে বিদেশে অবস্থানরত নিজস্ব নাগরিকদের দেশে ফেরার পথে কঠোর আইনি ও প্রশাসনিক বাধা তৈরি করছে অস্ট্রেলিয়া সরকার। বিশেষ করে যারা সংঘাতপূর্ণ অঞ্চল বা সন্দেহভাজন এলাকায় অবস্থান করছেন, তাদের ক্ষেত্রে এই 'নো এন্ট্রি' নীতি প্রয়োগ করা হচ্ছে। ক্যানবেরার এই সিদ্ধান্তকে মানবাধিকার সংগঠনগুলো 'অসাংবিধানিক' বলে অভিহিত করলেও সরকার তার অবস্থানে অনড়।
অস্ট্রেলিয়ার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী টনি বার্ক জানিয়েছেন, দেশের নিরাপত্তার কথা ভেবেই এই সিদ্ধান্ত।
অস্ট্রেলিয়া সরকারের দাবি, যারা মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতপূর্ণ অঞ্চল বা উগ্রবাদী গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রিত এলাকায় দীর্ঘ সময় কাটিয়েছেন, তারা দেশে ফিরলে অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকি হয়ে দাঁড়াতে পারেন। সরকারের প্রধান উদ্বেগের জায়গাগুলো হলো, প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত বা আদর্শিক পরিবর্তনের শিকার নাগরিকদের মাধ্যমে দেশে উগ্রবাদ ছড়ানোর আশঙ্কা।
বড় সংখ্যার নাগরিকদের ওপর সার্বক্ষণিক নজরদারি চালানোর মতো পর্যাপ্ত সম্পদের অভাব।
দেশটির প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি আলবানিজ বলেছেন, এই দলে অনেক শিশুও আছে। এটি দুঃখজনক যে তাদের বাবা-মায়ের উগ্র মতাদর্শের কারণে আজ শিশুরা বিপদে পড়েছে।
অস্ট্রেলিয়া সরকার 'টেমপরারি এক্সক্লুশন অর্ডার' (TAO) বা সাময়িক বর্জন আদেশের মাধ্যমে নাগরিকদের প্রবেশে বাধা দিচ্ছে। এর আওতায়:
কোনো নাগরিককে দুই বছর পর্যন্ত অস্ট্রেলিয়ায় প্রবেশে বাধা দেওয়া যেতে পারে।প্রবেশ করতে দিলেও অত্যন্ত কঠোর শর্ত এবং নিয়মিত নজরদারির অধীনে থাকতে হয়।নাগরিকত্ব বাতিলের মতো কঠোর আইনও কিছু ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা হচ্ছে।
অস্ট্রেলিয়ার এই নীতিকে অনেকেই 'নাগরিকত্বকে একটি বিশেষ সুবিধায় (Privilege) রূপান্তর' করার চেষ্টা হিসেবে দেখছেন। মানবাধিকারকর্মীদের মতে:
নিজ দেশে ফিরতে না দিলে একজন নাগরিক কার্যত রাষ্ট্রহীন হয়ে পড়েন, যা আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন।সিরিয়া বা ইরাকের ক্যাম্পে আটকে থাকা নারী ও শিশুদের দেশে ফিরতে না দেওয়াকে অমানবিক হিসেবে দেখা হচ্ছে। সমালোচকদের দাবি, এই আইন মূলত দ্বৈত নাগরিকদের ওপর বেশি প্রয়োগ করা হচ্ছে, যা বৈষম্যমূলক।
সিরিয়া থেকে এই পরিবারগুলোকে ফিরিয়ে আনা নিয়ে অস্ট্রেলিয়ায় ব্যাপক বিতর্ক চলছে। অনেক সাধারণ মানুষ এর প্রতিবাদ করছেন। রাজনৈতিকভাবেও সরকার চাপের মুখে আছে, কারণ অভিবাসন বিরোধী দলগুলোর জনপ্রিয়তা এখন অনেক বেড়ে গেছে। সূত্র : রয়টার্স
অস্ট্রেলিয়ার এই 'নিরাপত্তা প্রথম' নীতি নিউজিল্যান্ড এবং যুক্তরাজ্যের মতো দেশগুলোকেও প্রভাবিত করছে। তবে অস্ট্রেলিয়ার উচ্চ আদালত এবং মানবাধিকার কমিশন এই আইনের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলায় বিষয়টি এখন আইনি লড়াইয়ের মুখে পড়েছে।
নিজ নাগরিকদের দেশে ঢুকতে বাধা দেওয়ার এই ঘটনা আধুনিক গণতান্ত্রিক ইতিহাসে বিরল। নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গিয়ে রাষ্ট্র কি তার নিজের জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতা এড়িয়ে যাচ্ছে?—এই প্রশ্নই এখন বিশ্বজুড়ে বড় হয়ে দেখা দিয়েছে।