প্রকাশিত:
গতকাল

বাংলাদেশ সীমান্ত ঘিরে বাড়তে থাকা নিরাপত্তা উদ্বেগ ও কৌশলগত বাস্তবতার প্রেক্ষাপটে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কার পরিত্যক্ত একাধিক বিমানঘাঁটি পুনরুজ্জীবিত করার উদ্যোগ নিয়েছে নয়াদিল্লি। মূলত পশ্চিমবঙ্গ, আসাম ও ত্রিপুরায় অবস্থিত এসব পুরোনো বিমানঘাঁটি পুনরুদ্ধারের মাধ্যমে আঞ্চলিক যোগাযোগ বাড়ানো এবং সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতে সামরিক প্রস্তুতি জোরদার করাই এই পরিকল্পনার লক্ষ্য।
মঙ্গলবার টাইমস অব ইন্ডিয়ার প্রতিবেদনে বলা হয়, ভারতীয় সরকারের সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর বরাতে জানা গেছে এ তথ্য।
ভারতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, মূলত পশ্চিমবঙ্গ, আসাম এবং ত্রিপুরা রাজ্যে অবস্থিত এই ঘাঁটিগুলো কৌশলগতভাবে বাংলাদেশের সীমান্তের অত্যন্ত কাছে।ঘাঁটিগুলো হলো:
১. কৈলাশহর (ত্রিপুরা): বাংলাদেশের মৌলভীবাজার ও সিলেট সীমান্তের একদম কাছে অবস্থিত।
২. বিলাসিপাড়া (আসাম): বাংলাদেশের কুড়িগ্রাম ও রংপুর অঞ্চলের আকাশসীমার সন্নিকটে এর অবস্থান।
৩. শালবনি (পশ্চিমবঙ্গ): ঝাড়গ্রাম জেলা ও উত্তর-পশ্চিম বাংলাদেশ সীমান্তের নিকটবর্তী কৌশলগত পয়েন্ট।
৪. অ্যামারদা রোড (ওড়িশা/পশ্চিমবঙ্গ সীমান্ত): এটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অন্যতম দীর্ঘ রানওয়ে সমৃদ্ধ ঘাঁটি।
৫. ডিব্রুগড় সংলগ্ন চাবুয়া (আসাম): যা মূলত উত্তর-পূর্ব ভারতের গভীর নিরাপত্তা ও নজরদারির কেন্দ্র হিসেবে কাজ করবে।
এই উদ্বেগ আরও বেড়েছে বাংলাদেশের রংপুর অঞ্চলের লালমনিরহাট বিমানঘাঁটি পুনর্নির্মাণ উদ্যোগকে কেন্দ্র করে। শিলিগুড়ি করিডোরের কাছাকাছি অবস্থিত এই বিমানঘাঁটি নিয়ে ভারতের নিরাপত্তা মহলে বেশ উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। গত এক বছরে বাংলাদেশ থেকে এই করিডোর বিচ্ছিন্ন করার হুমকির কথাও একাধিকবার উঠে এসেছে বলে ভারতীয় নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা দাবি করেছেন।
এরই মধ্যে ভারত এই অঞ্চলগুলোর সামরিক উপস্থিতি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়েছে।ঐতিহাসিকভাবে এই অঞ্চলগুলোর বিমানঘাঁটির গুরুত্ব ছিল ব্যাপক। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল মিত্রবাহিনীর জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ লজিস্টিক ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহৃত হয় এগুলো। বার্মা (বর্তমান মিয়ানমার) অভিমুখে জাপানি বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযানে আসাম, ত্রিপুরা ও বাংলার বিভিন্ন এলাকায় গড়ে ওঠে অসংখ্য এয়ারস্ট্রিপ। এগুলো চীন–বার্মা–ভারত থিয়েটার, বার্মা ক্যাম্পেইন এবং লেডো (স্টিলওয়েল) রোডের মতো গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহ পথকে সমর্থন দিয়েছিল।
এই ঘাঁটিগুলোতে কেবল যুদ্ধবিমান নয়, বরং অত্যাধুনিক S-400 এয়ার ডিফেন্স মিসাইল সিস্টেম এবং দূরপাল্লার নজরদারি ড্রোন (UAV) মোতায়েন করার পরিকল্পনা রয়েছে ভারতের। এর ফলে বাংলাদেশের আকাশসীমার ওপর দিয়ে যেকোনো ধরনের উড্ডয়ন ভারতের রাডারে সহজে ধরা পড়বে।
টাইমস অব ইন্ডিয়া বলছে, ভারতের দৃষ্টিতে এসব ঐতিহাসিক বিমানঘাঁটি পুনরুজ্জীবন কেবল যোগাযোগ উন্নয়ন নয়, বরং কৌশলগত গভীরতা বাড়ানোরও একটি বড় পদক্ষেপ। একসময় যে অঞ্চল বিশ্বযুদ্ধের গতিপথ নির্ধারণে ভূমিকা রেখেছিল, সেই অঞ্চলই আবারও ভারতের জাতীয় নিরাপত্তায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে—এমন বাস্তবতা মাথায় রেখেই এই উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।
ভারতের এই সামরিক তৎপরতায় ঢাকার প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মধ্যে উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে। তাদের মতে, কোনো দেশের সীমান্ত ঘেঁষে এভাবে গণহারে পরিত্যক্ত ঘাঁটি সচল করা প্রতিবেশী সুলভ আচরণের মধ্যে পড়ে না এবং এটি আঞ্চলিক স্থিতিশীলতায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।