প্রকাশিত:
গতকাল

বাংলাদেশের ১৩তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে বিজয়ী হওয়ার পর বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান তাঁর নতুন সরকারের বিদেশনীতির মূলমন্ত্র ঘোষণা করেছেন। গত কয়েক দশকের ‘ভারসাম্যের রাজনীতি’র ঊর্ধ্বে উঠে তাঁর স্লোগান এখন— “দিল্লি নয়, পিণ্ডি নয়, নয় অন্য কোনো দেশ; সবার আগে বাংলাদেশ।”
বাংলাদেশি ভূখণ্ড ব্যবহার করে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে যাতায়াতের সুযোগ দেওয়া হলেও তিস্তা পানি বণ্টন চুক্তি অমীমাংসিত থেকে যায়। সীমান্তে হত্যাকাণ্ডও বন্ধ হয়নি। জ্বালানিখাতে বাংলাদেশ ক্রমেই ভারতীয় বিদ্যুতের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। বড় অবকাঠামো ও বিদ্যুৎ প্রকল্প দ্রুত অনুমোদিত হলেও স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন ছিল।
কূটনৈতিকভাবে সংবেদনশীল বিষয়ে ঢাকা কখনো প্রকাশ্যে ভারতের বিরোধিতা করেনি। সমর্থকদের কাছে এটি ছিল পরিমিত রাষ্ট্রনীতি, কিন্তু বিরোধীদের কাছে এটি ছিল আত্মনিয়ন্ত্রণহীনতা। ক্ষমতাচ্যুতির পর হাসিনার দিল্লিতে আশ্রয় নেয়া সেই ধারণাকে আরও জোরালো করে।
বিশ্লেষকদের মতে, তারেক রহমানের এই ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতি দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে:
ভারতের প্রতি বার্তা দিয়ে তারেক রহমান স্পষ্ট করেছেন যে, ভারত বাংলাদেশের ঘনিষ্ঠ প্রতিবেশী এবং বন্ধু। তবে তিস্তা পানি বণ্টন চুক্তি এবং সীমান্ত হত্যার মতো অমীমাংসিত ইস্যুগুলোতে বাংলাদেশ এখন থেকে আরও জোরালো অবস্থান নেবে। এটি কোনো সংঘাত নয়, বরং অধিকার আদায়ের পথ ।
পাকিস্তানের (পিণ্ডি) সাথে সম্পর্ককে কেবল বাণিজ্যিক ও সৌজন্যমূলক পর্যায়ে সীমাবদ্ধ রাখার ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। ‘ইসলামাবাদ-প্রীতি’র পুরনো তকমা মুছে ফেলে তিনি বাংলাদেশকে একটি স্বাধীন বৈশ্বিক শক্তি হিসেবে তুলে ধরতে চান।
তারেক রহমানের এই স্বনির্ভর অবস্থানের প্রশংসা করেছে অনেক আন্তর্জাতিক মাধ্যম। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারসহ অনেক বিশ্বনেতা ইতিমধ্যে তাঁকে অভিনন্দন জানিয়েছেন এবং অংশীদারত্ব জোরদারে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। ‘দ্য ডিপ্লোম্যাট’ ও ‘গার্ডিয়ান’-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি জানিয়েছেন, তাঁর লক্ষ্য কোনো ব্লক বা জোটে যোগ দেওয়া নয়, বরং বাংলাদেশের মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাড়ানো এবং টেকসই গণতন্ত্র নিশ্চিত করা।
ইতোমধ্যে তারেক রহমান দিল্লি ও ইসলামাবাদ উভয় রাজধানী থেকেই শুভেচ্ছা বার্তা পেয়েছেন।বাংলাদেশ সম্ভবত ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখবে, তবে একই সঙ্গে চীনের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলবে এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পৃক্ততা বাড়াবে। পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণও এই পরিবর্তনের অংশ হতে পারে। মূল বিষয় নাটকীয় পরিবর্তন নয়, বরং বার্তাটি- বাংলাদেশ নিজস্ব স্বার্থের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেবে।
দীর্ঘ দেড় দশকের নির্বাসন কাটিয়ে ক্ষমতায় ফেরার পর তারেক রহমান যে পরিপক্কতা দেখিয়েছেন, তা কেবল দেশের রাজনীতিতেই নয়, দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতেও বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। ‘তারেক মডেল’ সফল হলে বাংলাদেশ কেবল একটি ক্ষুদ্র রাষ্ট্র নয়, বরং এই অঞ্চলের একটি স্বাধীন ও আত্মমর্যাদাশীল অর্থনৈতিক শক্তিতে পরিণত হতে পারে।