প্রকাশিত:
গতকাল

পশ্চিমা বিশ্বের ক্রমাগত নিষেধাজ্ঞা এবং অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর তীব্র প্রতিরোধের মুখে টিকে থাকতে রাশিয়ার সঙ্গে কৌশলগত সামরিক জোট আরও শক্তিশালী করল মিয়ানমারের জান্তা সরকার। রাজধানী নেপিডোয় আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে দুই দেশের মধ্যে আগামী ৫ বছরের জন্য একটি ব্যাপক প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই চুক্তির মাধ্যমে মিয়ানমারে রাশিয়ার প্রভাব যেমন বাড়বে, তেমনি জান্তা বাহিনী তাদের হারানো মনোবল ফিরে পাওয়ার চেষ্টা করবে।
সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ২০২১ সালে ক্ষমতা দখল করে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী। এরপর থেকেই দেশটিতে গৃহযুদ্ধ চলছে। বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে অভিযান চালাতে রাশিয়া ও প্রতিবেশী চীনের সহায়তার ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভর করছে জান্তা সরকার।
রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানায়, সোমবার মিয়ানমার সফর করেন রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের শীর্ষ নিরাপত্তা কর্মকর্তা সের্গেই শোইগু। তার এ সফর শেষে দুই দেশের মধ্যে নতুন সামরিক সহযোগিতা চুক্তির ঘোষণা দেয়া হয়।
২০২৬ থেকে ২০৩১ সাল পর্যন্ত কার্যকর হতে যাওয়া এই চুক্তির অধীনে রাশিয়া মিয়ানমারকে সরাসরি অত্যাধুনিক যুদ্ধ সরঞ্জাম সরবরাহ করবে। চুক্তির প্রধান দিকগুলো হলো: জান্তা বাহিনীকে উন্নত মানের কামিকাজে ড্রোন এবং স্বল্প পাল্লার মিসাইল ডিফেন্স সিস্টেম সরবরাহ করবে মস্কো। মিয়ানমারের কয়েক হাজার সেনাকে রাশিয়ায় উন্নত সামরিক কৌশল ও প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহী দমন ও সীমান্ত সুরক্ষায় দুই দেশ গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান করবে।
বর্তমানে মিয়ানমারের জান্তা বাহিনী ‘থ্রি ব্রাদারহুড অ্যালায়েন্স’ সহ বিভিন্ন বিদ্রোহী গোষ্ঠীর কাছে অনেক গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল ও বর্ডার আউটপোস্ট হারিয়ে কোণঠাসা অবস্থায় রয়েছে। এই সংকটকালে রাশিয়ার মতো পরাশক্তির সমর্থন তাদের আন্তর্জাতিক বৈধতা এবং সামরিক শক্তির ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করবে।
অন্যদিকে, ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে একঘরে হওয়া রাশিয়া দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় তার অস্ত্রের বাজার ধরে রাখতে এবং ভূ-রাজনৈতিক আধিপত্য বজায় রাখতে মিয়ানমারকে একটি প্রধান ক্ষেত্র হিসেবে বেছে নিয়েছে।
সরকারি ফল অনুযায়ী, সেনাবাহিনী-সমর্থিত দল হিসেবে পরিচিত ইউনিয়ন সলিডারিটি অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি (ইউএসডিপি) ৮০ শতাংশের বেশি আসনে জয় পেয়েছে। তবে বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলো এ নির্বাচনকে অবৈধ ও সেনাশাসনকে নতুনভাবে বৈধতা দেয়ার কৌশল বলে প্রত্যাখ্যান করেছে। বিশ্লেষকদের মতে, এ ভোট আয়োজন দেশটির চলমান গৃহযুদ্ধ থামাতে পারবে—এমন সম্ভাবনা খুবই কম।
বাংলাদেশী কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, রাশিয়ার অত্যাধুনিক অস্ত্রে জান্তা বাহিনী সজ্জিত হলে সীমান্ত এলাকায় উত্তেজনা আরও বাড়তে পারে। এছাড়া, জান্তা সরকার সামরিকভাবে শক্তিশালী হলে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া আরও দীর্ঘায়িত বা জটিল হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
রাশিয়া ও মিয়ানমারের এই ৫ বছরের সামরিক চুক্তি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় অস্ত্রের প্রতিযোগিতা বাড়িয়ে দিতে পারে। এটি কেবল মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ সংকটকেই দীর্ঘায়িত করবে না, বরং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য একটি নতুন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।