প্রকাশিত:
গতকাল

দক্ষিণ গাজার কেরেম শালোম ক্রসিং দিয়ে নীল রঙের প্লাস্টিক ব্যাগে মোড়ানো এই নিথর দেহগুলো ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের কাছে বুঝিয়ে দেয় ইসরায়েলি সেনাবাহিনী। নিখোঁজ স্বজনদের ফেরার অপেক্ষায় থাকা পরিবারগুলো যখন মুক্তির বদলে লাশের বহর দেখতে পায়, তখন গাজার আকাশ-বাতাস কান্নায় ভারী হয়ে ওঠে।
তুরস্কের রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা আজ বৃহস্পতিবার এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানিয়েছে।
এর আগে গতকাল বুধবার এক বিবৃতিতে গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, রেড ক্রসের যানবাহনে ৫৪টি লাশ ও মানব দেহাবশেষ থাকা ৬৬টি বাক্স গাজার আল-শিফা মেডিকেল কমপ্লেক্সে পৌঁছেছে।
ফিলিস্তিনি স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, হস্তান্তরিত এই মরদেহগুলোর কোনো নাম বা পরিচয় নিশ্চিত করা হয়নি। প্রতিটি ব্যাগের ওপর কেবল একটি করে ‘সিরিয়াল নম্বর’ লিখে দিয়েছে ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ। গাজার সিভিল ডিফেন্স কর্মীরা জানিয়েছেন, মরদেহগুলোর অবস্থা অত্যন্ত শোচনীয় এবং অনেক ক্ষেত্রেই পরিচয় শনাক্ত করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
মরদেহগুলো গাজায় পৌঁছানোর পর অ্যাম্বুলেন্সের দীর্ঘ সারি সেগুলোকে খান ইউনিসের নাসের হাসপাতালের দিকে নিয়ে যায়। যেহেতু পরিচয় নিশ্চিত হওয়া যায়নি, তাই যথাযথ ধর্মীয় মর্যাদা রক্ষা করে একটি গণকবরে এই ৫৪ জন ফিলিস্তিনিকে দাফন করার প্রস্তুতি চলছে।
ফিলিস্তিনি প্রিজনার্স ক্লাব এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থার দাবি, এই বন্দিরা ইসরায়েলি বন্দিশালায় থাকা অবস্থায় চরম শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়ে মৃত্যুবরণ করেছেন। অভিযোগ উঠেছে যে, অসুস্থ বন্দিদের প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সেবা দেওয়া হয়নি। অনেক মুক্তিপ্রাপ্ত বন্দি আগে জানিয়েছিলেন যে, ইসরায়েলি জেলগুলোতে তাদের পর্যাপ্ত খাবার ও পানি সরবরাহ করা হতো না। বিশেষ করে নেগেভ মরুভূমির 'সদে তেইমান' (Sde Teiman) ডিটেনশন সেন্টারের পরিস্থিতিকে ‘নতুন গুয়ান্তানামো বে’ হিসেবে অভিহিত করেছেন মানবাধিকার কর্মীরা।
যুক্তরাষ্ট্রের ঘোষিত জানুয়ারি মাসের যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে গাজা থেকে ইসরাইলের অতিরিক্ত সেনা প্রত্যাহার এবং পুনর্গঠন কার্যক্রম শুরুর বিধান রয়েছে। জাতিসংঘের হিসেবে, গাজা পুনর্গঠনে আনুমানিক ৭০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ব্যয় হতে পারে।
উল্লেখ্য, যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় চলমান যুদ্ধবিরতি থাকা সত্ত্বেও বুধবার ভোরে গাজায় ইসরাইলি হামলায় নারী ও শিশুসহ অন্তত ২১ জন ফিলিস্তিনি নিহত। এই বর্বর হামলায় আরও অনেকে আহত হন বলে চিকিৎসা সূত্র জানিয়েছে।
ফিলিস্তিন রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি জানায়, দক্ষিণ গাজার খান ইউনিসের আল-মাওয়াসি এলাকার স্ট্রিট-৫ সংলগ্ন এলাকায় গোলাবর্ষণে একজন প্যারামেডিকসহ ২ জন নিহত এবং আরও ১২ জন আহত হন।
গাজার চলমান যুদ্ধ এবং ইসরায়েলি কারাগারে বন্দিদের মৃত্যুর এই মিছিল আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে বড় এক প্রশ্নচিহ্ন ছুঁড়ে দিয়েছে। যুদ্ধবন্দিদের অধিকার রক্ষা সংক্রান্ত জেনেভা কনভেনশন এখানে কতটা কার্যকর, তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে জাতিসংঘ। ৫৪টি মরদেহের এই সারি ফিলিস্তিনি জনগণের বঞ্চনা ও বেদনার এক নতুন মহাকাব্য হয়ে রইল।