প্রকাশিত:
গতকাল

বাংলাদেশে একটি রূপান্তরমুখী সাধারণ নির্বাচনের মাত্র ৭২ ঘণ্টা আগে, ৯ই ফেব্রুয়ারি ঢাকা থেকে একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দল ওয়াশিংটনে যাচ্ছেন এমন একটি বাণিজ্য চুক্তি চূড়ান্ত করতে, যা দেশের অর্থনৈতিক গতিপথকে মৌলিকভাবে পুনর্গঠন করতে পারে।সাধারণত এ ধরণের চুক্তি সম্পন্ন করতে কয়েক বছর সময় লাগলেও, বর্তমান ক্ষেত্রে উভয় পক্ষই অভাবনীয় দ্রুততা দেখাচ্ছে। কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই দ্রুতগতির চুক্তির পেছনে কেবল অর্থনীতি নয়, বরং গভীর ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ কাজ করছে।
দেশের ভেতরে সমালোচকরা এ সময় নির্ধারণকে অন্তর্বর্তী সরকারের একটি কৌশলগত পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন। নির্বাচনের প্রাক্কালে আন্তর্জাতিক বৈধতা নিশ্চিত করার প্রয়াস বলে ব্যাখ্যা করছেন অনেকে। তবে বাস্তবে এই চুক্তির পেছনে রয়েছে আরও গভীর এবং প্রায় অস্তিত্বগত অর্থনৈতিক বাধ্যবাধকতা।
নির্বাচনকালীন সময়ে বাজারে এক ধরণের অনিশ্চয়তা কাজ করে। এই মুহূর্তে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে বড় ধরণের কোনো চুক্তি স্বাক্ষর হলে তা দেশি-বেশি বিনিয়োগকারীদের মধ্যে ইতিবাচক বার্তা দেবে। বিশেষ করে ডলার সংকটের এই সময়ে মার্কিন বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য একটি বড় রক্ষাকবচ হতে পারে।
বাইডেন প্রশাসন তাদের বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খল (Supply Chain) থেকে চীনের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে আনতে চাইছে। বাংলাদেশ যেহেতু তৈরি পোশাক ও ওষুধ শিল্পে শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে, তাই যুক্তরাষ্ট্র দ্রুত একটি কাঠামোগত চুক্তির মাধ্যমে বাংলাদেশকে তাদের দীর্ঘমেয়াদী নির্ভরযোগ্য অংশীদার হিসেবে নিশ্চিত করতে চায়।
বাংলাদেশ যে অর্থনৈতিক খাদের কিনারায় দাঁড়িয়ে আছে, তা অত্যন্ত স্পষ্ট। ২৪ নভেম্বর ২০২৬ নির্ধারিত এলডিসি উত্তরণ এমন এক যুগের অবসান ঘটাবে, যা কয়েক দশক ধরে শুল্কমুক্ত ও একতরফা বাজারসুবিধার ওপর দাঁড়িয়ে ছিল। একটি এমন অর্থনীতির জন্য, যেখানে তৈরি পোশাক খাতই মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮৫ শতাংশ জোগান দেয়, এই রূপান্তরের ঝুঁকি অপরিসীম।
পলিসি বিশ্লেষকরা সতর্ক করেছেন, অগ্রাধিকারমূলক বাজারসুবিধা হারালে প্রতিবছর সর্বোচ্চ ৮ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত রপ্তানি আয় কমে যেতে পারে। যার প্রভাব পড়বে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ থেকে শুরু করে শিল্পখাতে কর্মসংস্থান পর্যন্ত।
দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকা জিএসপি (GSP) সুবিধা পুনর্বহাল এবং শ্রম অধিকার নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কিছু কঠোর শর্ত ছিল। ধারণা করা হচ্ছে, পর্দার আড়ালে বাংলাদেশ সরকার বেশ কিছু বড় সংস্কারে সম্মত হয়েছে, যার বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র নির্বাচনের আগেই এই চুক্তিটি উপহার হিসেবে দিচ্ছে।
দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের পাশাপাশি বাংলাদেশকে একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে দেখে ওয়াশিংটন। নির্বাচনের আগে তড়িঘড়ি এই চুক্তি ইঙ্গিত দেয় যে, যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের সাথে একটি স্থিতিশীল ও দীর্ঘমেয়াদী কৌশলগত সম্পর্ক বজায় রাখতে আগ্রহী, যাতে অঞ্চলের ক্ষমতার ভারসাম্য বজায় থাকে।
নতুন বাণিজ্য চুক্তিটি প্রাচীর ভাঙার লক্ষ্যেই গড়ে তোলা হয়েছে একটি উদ্ভাবনী সরবরাহ-শৃঙ্খলভিত্তিক কাঠামোর মাধ্যমে। ‘স্কয়ার-মিটার বিনিময়ে স্কয়ার-মিটার’ নীতির আওতায়, বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রে উৎপাদিত কাঁচা তুলা ও কৃত্রিম তন্তু যতটা আমদানি করবে, তার অনুপাতে পোশাক রপ্তানিতে শুল্কমুক্ত সুবিধা পাবে। এটি একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের কৃষিপণ্য রপ্তানির লক্ষ্য পূরণ করে, অন্যদিকে বাংলাদেশের পোশাকশিল্পকে প্রতিযোগিতামূলক মূল্য ধরে রাখার জন্য প্রয়োজনীয় শুল্ক-সুরক্ষা দেয়।
নির্বাচনের আগেই চুক্তিটি সই করে ইউনূস প্রশাসন কার্যত দেশের ভবিষ্যৎ নীতিকাঠামোর ভেতরে একটি প্রো-পশ্চিমা বাণিজ্যিক অভিমুখ স্থায়ীভাবে প্রোথিত করে দিচ্ছে, যা পরবর্তী কোনো সরকারের জন্য সহজে উল্টে দেয়া কঠিন হবে।
ভূরাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকেও এই চুক্তি বাংলাদেশের সূক্ষ্ম ভারসাম্য রক্ষার কৌশলের অংশ। একদিকে চীনের অবকাঠামো বিনিয়োগ, অন্যদিকে ভারতের সঙ্গে নিরাপত্তা সহযোগিতা- এই বাস্তবতায় যুক্তরাষ্ট্র এখনো বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান বৈদেশিক বিনিয়োগকারী এবং শিল্পপণ্যের চূড়ান্ত ভোক্তা। ওয়াশিংটনের সঙ্গে গভীর বাণিজ্যিক সম্পর্ক ঢাকা যেন কোনো একক শক্তির ওপর অতিনির্ভরশীল না হয়ে পড়ে, সে ভারসাম্য রক্ষা করে।
ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠনগুলো এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছে। তাদের মতে, নির্বাচনের পর নতুন সরকার আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করলে অনেক সময় নষ্ট হতো। আগেভাগে চুক্তিটি হয়ে গেলে রপ্তানি আদেশে এর ইতিবাচক প্রভাব পড়বে এবং মার্কিন বাজারে বাংলাদেশের পণ্যের শুল্কমুক্ত প্রবেশের পথ সুগম হবে।
তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের কেউ কেউ মনে করছেন, নির্বাচনের আগে এমন বড় কোনো চুক্তি ভোটারদের মন জয় করার একটি কৌশল হতে পারে। বিরোধীদের পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে, এই চুক্তির মাধ্যমে সরকার বহির্বিশ্বের সমর্থন নিশ্চিত করার চেষ্টা করছে।
বাংলাদেশের জন্য এলডিসি-উত্তরণ-পরবর্তী জীবনের প্রস্তুতির জানালা দ্রুত বন্ধ হয়ে আসছে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এই বাণিজ্য চুক্তিই হয়তো সেই সময়ের মধ্যে অর্জিত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার, যাতে জানালা বন্ধ হলে পোশাক কারখানার আলো নিভে না যায়। এই চুক্তি নতুন সমৃদ্ধির ভিত্তি হবে নাকি অর্থনৈতিক সংকোচনের এক পাদটীকা, তা নির্ভর করবে আসন্ন নির্বাচনের পর যে সরকার ক্ষমতায় আসবে, তার রাজনৈতিক সদিচ্ছার ওপর।
সূত্রমতে, আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই দুই দেশের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিরা একটি খসড়া চূড়ান্ত করবেন। যদি সবকিছু ঠিক থাকে, তবে নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার আগেই এই ‘মেগা ডিল’ স্বাক্ষরিত হতে পারে।