প্রকাশিত:
গতকাল

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ আজ এক আদেশে জানিয়েছে, মানবতাবিরোধী অপরাধের বিভিন্ন মামলায় জব্দকৃত আলামতগুলো নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য জাদুঘরে প্রদর্শন করা যাবে। ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বেঞ্চ এই অনুমতি প্রদান করেন। প্রসিকিউশন পক্ষের আবেদনের প্রেক্ষিতে আদালত এই জনগুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেন।
সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এই জাদুঘর স্থাপনের মূল উদ্দেশ্য হলো বিপ্লবের ইতিহাসকে বিকৃতি থেকে রক্ষা করা। গণভবনের ভেতরে যেখানে যেখানে রক্তের দাগ লেগে ছিল বা বুলেটের আঘাত রয়েছে, সেগুলোর অনেক জায়গা কাঁচ দিয়ে ঘিরে স্থায়ীভাবে সংরক্ষণ করা হচ্ছে। এটি হবে বিশ্বের এমন এক বিরল জাদুঘর, যা ক্ষমতার দম্ভের পতনের গল্প বলবে।
জাদুঘরটির নকশা তৈরির জন্য ইতিমধ্যেই দেশি-বিদেশি স্থপতিদের পরামর্শ নেওয়া হয়েছে। মূল ভবনের খুব বেশি পরিবর্তন না করে এর পরিবেশ ও স্থাপত্যকে অভ্যুত্থানের ইতিহাসের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়া হচ্ছে। ভবনটির একটি বড় অংশ উৎসর্গ করা হবে আন্দোলনের সময় নিখোঁজ হওয়া এবং কারাবন্দী থাকা ব্যক্তিদের স্মৃতির উদ্দেশ্যে।
জাদুঘর কর্তৃপক্ষ এবং অভ্যুত্থান স্মৃতি সংরক্ষণ কমিটি দেশব্যাপী সংগৃহীত অসংখ্য স্মারক এখানে প্রদর্শন করবে। জাদুঘরে যেসব আলামত প্রদর্শিত হবে তার মধ্যে রয়েছে, শহীদ আবু সাঈদের চশমা, মুগ্ধর পানির বোতল এবং আন্দোলনকারীদের রক্তমাখা পোশাক ও ব্যবহৃত জুতো।বিভিন্ন গোপন টর্চার সেল বা ‘আয়নাঘর’ থেকে উদ্ধারকৃত নির্যাতনের সেই সব চেয়ার, লোহার শিকল ও বিভীষিকাময় সরঞ্জাম—যা বিগত দেড় দশকের দুঃশাসনের সাক্ষ্য দেবে।
৫ আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানের সময় গণভবনের দেওয়ালে আঁকা গ্রাফিতি এবং উত্তাল জনতার প্রবেশের ফলে তৈরি হওয়া ক্ষতগুলো সেভাবেই সংরক্ষণ করা হবে।আন্দোলনের ভিডিও ফুটেজ, আলোকচিত্র এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়া গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তগুলো নিয়ে তৈরি হবে একটি ডিজিটাল আর্কাইভ।আন্দোলনকারীদের দমনে ব্যবহৃত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিভিন্ন মরণাস্ত্র ও গুলির খোসা এবং নিহতদের ব্যবহৃত বিভিন্ন ব্যক্তিগত জিনিসপত্র যা মামলার তথ্য-প্রমাণ হিসেবে সংরক্ষিত ছিল, সেগুলোও প্রদর্শনীতে থাকছে।
এটি কেবল একটি প্রদর্শনশালা হবে না, বরং এখানে একটি গবেষণা কেন্দ্রও থাকবে, যেখানে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান এবং দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতি নিয়ে পর্যালোচনার সুযোগ থাকবে।
প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস নিজেই একাধিকবার নির্মাণকাজের অগ্রগতি পরিদর্শন করেছেন এবং এর ঐতিহাসিক গুরুত্বের ওপর জোর দিয়েছেন।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, মামলার আলামতগুলো জাদুঘরে প্রদর্শনের মাধ্যমে একদিকে যেমন ইতিহাসের স্বচ্ছতা নিশ্চিত হবে, অন্যদিকে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার প্রক্রিয়ার প্রতি জনমনে আস্থা বাড়বে। মানুষ জানতে পারবে, পর্দার আড়ালে কীভাবে রাষ্ট্রীয় যন্ত্র ব্যবহার করে জনগণের ওপর নিপীড়ন চালানো হয়েছিল।
আগামী ২০ জানুয়ারি থেকে গণভবনের আঙিনায় পা রাখা প্রতিটি মানুষ সাক্ষী হবেন এক রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের। শহীদদের রক্তমাখা সেই সব পোশাক আর নির্যাতনের জঘন্য স্মারকগুলো চিৎকার করে বলবে স্বাধীনতার দ্বিতীয় বারের দাম কত ছিল। জুলাই গণ-অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর কেবল একটি ভবন নয়, এটি বাংলাদেশের মানুষের অধিকার আদায়ের এক অবিনশ্বর প্রতীক হয়ে থাকবে। শহীদদের রক্ত যেন বৃথা না যায়, সেই শপথ নিয়েই প্রস্তুত হচ্ছে এই স্মৃতি জাদুঘর।